টি–টুয়েন্টি ইতিহাসে সেরা দল কি তাহলে ভারত

· Prothom Alo

হরভজন সিং কোনো তুলনায় যেতে রাজি নন।

২০০৭ টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপ জেতা ভারতীয় এই স্পিনারের মতে, প্রতিটি যুগের খেলোয়াড় আলাদা, সময় আলাদা। তাই এক দলের সাফল্যের সঙ্গে আরেক দলের তুলনা চলে না। ১৯ বছর আগে জোহানেসবার্গে মহেন্দ্র সিং ধোনির দলের বিশ্বকাপ জয়ের বাটখারায় তাই আহমেদাবাদে সূর্যকুমার যাদবদের জয় না মাপার বার্তা তাঁর।

Visit asg-reflektory.pl for more information.

নতুন কোনো কথা নয়। অন্য খেলায়, অন্য উপলক্ষে অনেকেই এমন বলেছেন। এরপরও...এরপরও চূড়া ছাড়িয়ে আরও ওপরে যেতে মানুষের স্বভাবজাত যে তাড়না, তারই উপজাত হয়ে সেরার র‍্যাঙ্কিং হয়, সর্বকালের সেরার ভোট হয়। ২০২৬ আইসিসি টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের শিরোপা জয়ের পরও যা মহাসমারোহে উপস্থিত—ভারতের এ দলটিই কি টি–টুয়েন্টি ইতিহাসের সর্বকালের সেরা?

ইতিহাস বললে যতটা লম্বা সময়ের মনে হয়, টি–টুয়েন্টির বয়স ততটা নয়। এই শতাব্দীতে ক্রিকেটের আন্তর্জাতিক ক্যালেন্ডারে উদয় হওয়া খেলাটি মাত্রই ২১ বছর বয়সী। তবে অন্য দুই সংস্করণের তুলনায় ওভার কম আর দল অনেক গুণ বেশি বলে খেলা চলে হরদম। টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপও যেমন এবার দেখে ফেলল দশম আসর। যেটিতে নতুন ইতিহাস গড়েছে ভারত। সর্বোচ্চ তিনবার শিরোপা জিতেছে প্রথম দল হিসেবে শিরোপা ধরে রেখে। স্বাগতিক দেশের চ্যাম্পিয়ন হওয়াও এই প্রথম। তবে প্রশ্নটা এখানেই—ট্রফি কি সব সময় দলের প্রকৃত শক্তি বোঝায়? ইউরোপীয় ফুটবলে যে কারণে চ্যাম্পিয়নস লিগের চেয়ে লিগ জয়কে বেশি মাহাত্ম্যের সঙ্গে বরণ করে অনেকে। ভারতও কি তেমনই কোনো ‘টুর্নামেন্টের দল’?

আহমেদাবাদের ফাইনালে নিউজিল্যান্ডকে উড়িয়ে দিয়েছে ভারত

পরিসংখ্যানের খাতায় চোখ দিলে মনের ক্যানভাসে বড় একটা ‘না’ শব্দেরই দেখা মিলবে। রোববার রাতে আহমেবাদের যে নরেন্দ্র মোদি স্টেডিয়াম হয়ে গোটা ভারতে উৎসব ছড়িয়েছে, গুজরাটের সেই স্টেডিয়াম থেকেই জয়যাত্রার সূচনা ধরা যেতে পারে। ২০২৩ সালের নভেম্বরে এ মাঠেই ওয়ানডে বিশ্বকাপের ফাইনালে অস্ট্রেলিয়ার কাছে হেরেছিল ভারত। গ্যালারিতে হাজির হওয়া লাখখানেক দর্শক স্টেডিয়াম ছেড়েছিলেন একরাশ হতাশা আর হৃদয়ে যন্ত্রণা নিয়ে। ১০ মাস পর সেই যন্ত্রণার খানিকটা প্রলেপ হয় বার্বাডোজের মাটিতে, ২০২৪ টি–টুয়েন্টি বিশ্বকাপে ভারতের অপরাজিত চ্যাম্পিয়ন হওয়ার মাধ্যমে। রোহিত শর্মার দলের সেই শিরোপাটি ছিল আইসিসির টুর্নামেন্টে ১৩ বছর পর ভারতের প্রথম। এমন অনবদ্য এক প্রাপ্তির পরই হাসিমুখে টি–টুয়েন্টি ছাড়েন রোহিত শর্মা, বিরাট কোহলি আর রবীন্দ্র জাদেজা। নতুন অধিনায়ক হন সূর্যকুমার, কোচ গৌতম গম্ভীর। শুরু হয় ভারতের সাদা বলের ক্রিকেটে নতুন অধ্যায়। কিন্তু নতুনও কি?

ছক্কা আর সেঞ্চুরির বিশ্বকাপ

গম্ভীর–সূর্য জুটি আসলে ২০২৪ বিশ্বকাপ থেকে পাওয়া ব্যাটনটাই এগিয়ে নিয়ে যান। তাই এই ফেব্রুয়ারিতে ভারত যখন ঘরের মাঠে প্রথমবার বিশ্বকাপ জেতার লক্ষ্য নিয়ে মাঠে নামে, সঙ্গে ছিল অবিশ্বাস্য দুর্দান্ত ফর্মের আত্মবিশ্বাস আর সাহস। ২০২৩ সালের নভেম্বরের পর থেকে বিশ্বকাপ শুরুর আগপর্যন্ত ৫৯ টি–টুয়েন্টির ৪৯টিতেই জয় ছিল ভারতের, হারের সংখ্যা মাত্র ৮। দুই বছরের বেশি সময় ধরে পাওয়া এই সাফল্য যে কতটা বড়, সেটা ফুটে ওঠে দ্বিতীয় সর্বোচ্চ সাফল্য পাওয়া অস্ট্রেলিয়ার দিকে তাকালে। একই সময়ে সাবেক চ্যাম্পিয়নদের জয় হার ২৮ বনাম ১৪, শতাংশের হারে ভারতের প্রায় তিন ভাগের এক ভাগ!

ভারতের বিশ্বকাপ জয়ের অন্যতম দুই নায়ক সঞ্জু স্যামসন ও বরুণ চক্রবর্তী

ঘরের মাটিতে বিশ্বকাপ শুরুর আগে নিউজিল্যান্ডের বিপক্ষে পাঁচ ম্যাচের সিরিজ খেলেছিল ভারত। ওই পাঁচ ম্যাচের তিনটিই স্কোর ছাড়িয়েছে দুই শ, সর্বোচ্চ ছিল ২৭১। আরেকবার ১৫৪ রান তাড়া করে ফেলেছে ১০ ওভারের মধ্যে। হট ফেবারিট হিসেবে বিশ্বকাপ শুরু করে মাঝপথে একটু চাপে পড়েছিল ভারত। সুপার এইটে দক্ষিণ আফ্রিকার কাছে হারের পর শেষ চারটি ম্যাচই ছিল কার্যত কোয়ার্টার ফাইনাল। আর এই চার ম্যাচের মধ্যে সেমিফাইনাল, ফাইনালসহ তিনটিতে ভারতের রান ২০০ ছাড়িয়েছে। অন্যটিতে রান তাড়ায় ১৯৯। পরিসংখ্যান বলছে, টি–টুয়েন্টিতে ভারত দুই শর বেশি রান করেছে সাতবার। টি–টুয়েন্টি ক্রিকেটে এর কাছাকাছি পাঁচবার দুই শর বেশি করতে পেরেছে শুধু আইপিএলের দল সানরাইজার্স হায়দরাবাদ। আর এটি হয়েছে ফ্র্যাঞ্চাইজি ক্রিকেটের তুলনায় আন্তর্জাতিক ক্রিকেটের বেশি চাপ সয়েই। ২০২৩ থেকে বহুজাতিক টি–টুয়েন্টি টুর্নামেন্টে ২৭ ম্যাচ খেলে ভারত জিতেছে ২৫টিতেই, হার মাত্র একটি (অন্যটি পরিত্যক্ত)।

যত রেকর্ড দুমড়েমুচড়ে চ্যাম্পিয়ন ভারতসূর্যকুমার যাদব, অধিনায়ক, ভারতআমাদের পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। পরের লক্ষ্য অলিম্পিক জেতা।

এমন দাপুটে ক্রিকেটের রহস্য কী? কৃতিত্ব দেওয়া হচ্ছে যাঁকে, সেই গম্ভীরের ব্যাখ্যায় উঠে এসেছে দলের প্রতিটি জায়গায় একাধিক খেলোয়াড় থাকার বিলাসিতার কথা—‘আমরা চাইলে তিন, চার বা পাঁচটি ভিন্ন ভিন্ন কম্বিনেশন নিয়ে খেলতে পারতাম। দুজন রিস্ট স্পিনার নিয়ে খেলতে পারতাম, চাইলে আট নম্বর পর্যন্ত ব্যাটসম্যান রাখতে পারতাম। এমনকি টপ অর্ডারেও আমরা বিভিন্ন কম্বিনেশন সাজাতে পারতাম। আমাদের তিনজন ওপেনার ছিল, যারা যেকোনো সময় টপ অর্ডারে ব্যাটিং করতে সক্ষম ছিল।’

ফাইনালে ৪ উইকেট নিয়েছেন ভারতীয় পেসার যশপ্রীত বুমরা

আর এমন একটি দল আছে বলেই সংবাদকর্মীদের বলে দিলেন, ‘আমরা মাইলফলক উদ্‌যাপন করতে চাই না, ট্রফি উদ্‌যাপন করতে চাই।’

সেই ট্রফি তো বিশ্বকাপে এসেই গেল, তা–ও পরপর দুইটা। মাঝে এসেছে এশিয়া কাপের ট্রফিও। এখন তবে লক্ষ্য কী? শুনুন সূর্যকুমারের মুখে, ‘আমাদের পেছনে ফেরার সুযোগ নেই। পরের লক্ষ্য অলিম্পিক জেতা।’ ১৯০০ সালের পর লস অ্যাঞ্জেলেস দিয়ে অলিম্পিকে ফিরছে ক্রিকেট। ভারতের অর্জনের তালিকায় এখন যেন বাকি শুধু এটুকুই। তবে সেই অর্জন আসার আগে কি ভারতের এই দলকে টি–টুয়েন্টি ইতিহাসের সর্বকালের সেরা বলা যাবে না?

ভারতের হরভজন পরোক্ষে ‘না’ বললেও ইংল্যান্ডের সাবেক অধিনায়ক মাইকেল ভন কিন্তু সেই রায়টা দিয়েই দিয়েছেন, ‘ভারতই বিশ্বের সেরা টি–টুয়েন্টি দল, সেটা অনেক বেশি ব্যবধানেই।’

এক ট্রফিতেই ভারতের তিন ইতিহাস

Read full story at source