নিরাপদ পানির সমতায় কি ফিরবে নারীর হাসি

· Prothom Alo

পানির কোনো নিজস্ব রং নেই, কিন্তু আমাদের সমাজবাস্তবতায় পানির একটি গভীর লিঙ্গীয় বা জেন্ডার পরিচয় রয়েছে। যখন কোনো জনপদে নিরাপদ পানির অভাব দেখা দেয়, তখন তার প্রথম এবং প্রধান মাশুল দিতে হয় সেই এলাকার নারী ও কন্যাশিশুদের। বিশ্ব পানি দিবস ২০২৬-এর মূল প্রতিপাদ্য ‘পানি ও জেন্ডার’ এবং বাংলাদেশ সরকার কর্তৃক নির্ধারিত স্লোগান ‘পানির প্রবাহ যেখানে, সাম্যের হাসি সেখানে’—এই ধ্রুব সত্যটিকেই আজ বড় করে সামনে নিয়ে এসেছে।

Visit h-doctor.club for more information.

বাংলাদেশের গ্রামীণ ও দুর্গম জনপদে পানি সংগ্রহের দৃশ্যটি চিরকালই নারীনির্ভর। কলসি বা বালতি নিয়ে মাইলের পর মাইল তপ্ত বালু বা কাদা মাড়িয়ে হাঁটছেন একজন নারী—এটি কেবল আমাদের লোকজ শিল্পের উপাদান নয়, বরং এটি একটি কাঠামোগত লিঙ্গীয় বৈষম্যের প্রতিচ্ছবি। জয়েন্ট মনিটরিং প্রোগ্রাম (জেএমপি) এবং ইউনিসেফের সাম্প্রতিক বৈশ্বিক তথ্য অনুযায়ী, যেসব পরিবারে প্রাঙ্গণের ভেতরে পানির উৎস নেই, তাদের মধ্যে ১০টি পরিবারের ৮টিতেই নারী ও মেয়েরা পানি সংগ্রহের মূল দায়িত্ব পালন করেন। এই দীর্ঘ পথচলা এবং পানি বয়ে আনার পেছনে যে বিপুল শ্রম ও সময় ব্যয় হয়, তা সমাজতাত্ত্বিক ভাষায় ‘আনপেইড কেয়ার ওয়ার্ক’ বা অদৃশ্য শ্রম। এই শ্রমের কারণে নারীরা তাঁদের শিক্ষা, অর্থনৈতিক অংশগ্রহণ এবং বিশ্রামের মৌলিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হচ্ছেন।

উপকূলীয় অঞ্চলে একজন নারীকে প্রতিদিন ৫ থেকে ৬ কিলোমিটার পথ হাঁটতে হয় কেবল এক কলসি মিষ্টিপানির জন্য। এই সময়টি যদি তিনি কোনো আয়বৃদ্ধিমূলক কাজে ব্যয় করতে পারতেন, তবে তাঁর পরিবার ও দেশের অর্থনীতিতে তা সরাসরি ইতিবাচক প্রভাব ফেলত। বৈশ্বিক গবেষণা বলছে, পানির উৎস বাড়ির কাছাকাছি হলে মেয়েদের স্কুলে উপস্থিতির হার ১২ থেকে ১৫ শতাংশ বৃদ্ধি পায়। কারণ, পানি সংগ্রহের বোঝা না থাকায় তারা পড়াশোনায় ও সৃজনশীল কাজে বেশি সময় দিতে পারে।

এই গভীর বৈষম্য দূর করতে বাংলাদেশের ‘জাতীয় পানি সরবরাহ, স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি (ওয়াশ) নীতিমালা ২০২৫’ একটি মাইলফলক হতে পারে। এই নীতিমালায় প্রথমবারের মতো ‘জেন্ডার-রেসপন্সিভ ওয়াশ সলিউশন’-এর ওপর বিশেষ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। স্পষ্টভাবেই বলা হয়েছে যে পানি ব্যবস্থাপনার প্রতিটি স্তরে নারীর অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে। এটি কেবল পানি ব্যবহারের ক্ষেত্রে নয়, বরং প্রকৌশলগত পরিকল্পনা, কারিগরি রক্ষণাবেক্ষণ এবং নীতিনির্ধারণী নেতৃত্বে নারীকে নিয়ে আসার অঙ্গীকার। যখন একজন নারী পানির কল বা পাম্পের অবস্থান নির্ধারণের সিদ্ধান্ত দেন, তখন সেটি প্রাঙ্গণের কাছাকাছি হওয়ার সম্ভাবনা বাড়ে, যা সরাসরি তাঁর শ্রমের বোঝা কমায়।

বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য যে সরকারের হালনাগাদাধীন ‘দুর্গম এলাকার জাতীয় ওয়াশ কৌশলপত্র’ অনুযায়ী, চর, হাওর এবং পার্বত্য অঞ্চলের নারীদের জন্য বিশেষায়িত প্রযুক্তির প্রস্তাব করা হয়েছে। পার্বত্য এলাকায় যেখানে ঝরনা থেকে পানি সংগ্রহ করতে হয়, সেখানে ‘গ্র্যাভিটি ফ্লো সিস্টেম’ (জিএফএস) ব্যবহার করে পাড়ার কেন্দ্রবিন্দুতে পানি পৌঁছে দেওয়ার পরিকল্পনা নেওয়া হয়েছে। নীতিমালার ম্যাট্রিক্স অনুযায়ী, উপকূলীয় এলাকায় পারিবারিক ও সামাজিকভাবে বৃষ্টির পানি সংগ্রহ এবং সৌরচালিত পানি সরবরাহ ব্যবস্থার ওপর বিশেষ বরাদ্দ রাখা হয়েছে। এটি কেবল একটি প্রযুক্তিগত সমাধান নয়, এটি নারীর শারীরিক কষ্ট লাঘবের একটি মানবিক উদ্যোগ।

আন্তর্জাতিক প্রেক্ষাপটে কেনিয়া বা ভিয়েতনামের মতো দেশগুলো ‘কমিউনিটি লেড ওয়াশ’ মডেলে নারীকে টেকনিশিয়ান ও মেকানিক হিসেবে নিয়োগ দিয়ে সফল হয়েছে। বাংলাদেশও এই পথ অনুসরণ করে নারীদের ‘ওয়াশ উদ্যোক্তা’ হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। নিরাপদ স্যানিটেশন ও স্বাস্থ্যবিধি কেবল স্বাস্থ্যের বিষয় নয়, এটি নারীর মর্যাদা ও নিরাপত্তার সঙ্গে অবিচ্ছেদ্য। মাসিক স্বাস্থ্য ব্যবস্থাপনা বা পিরিয়ড চলাকালীন নিরাপদ পরিবেশের অভাবে অনেক কিশোরী প্রতি মাসে কয়েক দিন স্কুলে যাওয়া বন্ধ করে দেয়, যা দীর্ঘ মেয়াদে তাদের ঝরে পড়ার হার বাড়ায়। প্রস্তাবিত নতুন নীতিমালায় প্রতিটি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে জেন্ডার-সেপারেটেড টয়লেট এবং প্যাড পরিবর্তনের নিরাপদ ব্যবস্থা (পোশাক পরিবর্তনের কক্ষ) রাখা বাধ্যতামূলক করা হয়েছে।

বাংলাদেশের উচ্চ আদালত সম্প্রতি এক ঐতিহাসিক রায়ে নিরাপদ পানিকে সংবিধানের ৩২ অনুচ্ছেদের অধীনে ‘জীবন ধারণের অধিকার’-এর অংশ হিসেবে ঘোষণা করেছেন। এই রায় নারীদের জন্য এক শক্তিশালী আইনি হাতিয়ার। ২০৩০ সালের মধ্যে এসডিজি-৬ (নিরাপদ পানি) এবং এসডিজি-৫ (জেন্ডার সমতা) অর্জন করতে হলে আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি আমূল বদলাতে হবে।

নীতিনির্ধারক, রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও উন্নয়ন সহযোগীদের প্রতি আমাদের উদাত্ত আহ্বান, ওয়াশ বাজেট প্রণয়নের সময় ‘জেন্ডার লেন্স’ ব্যবহার করুন। মনে রাখবেন, পানির নিরাপদ প্রবাহ নিশ্চিত করা মানে কেবল তৃষ্ণা মেটানো নয়, বরং নারীর সময় বাঁচানো, তাঁর স্বাস্থ্য সুরক্ষা করা এবং তাঁর মুখে সাম্যের হাসি ফোটানো। ২০২৬ সালের এই বিশ্ব পানি দিবসে আমাদের জাতীয় অঙ্গীকার হোক—পানির প্রতিটি ফোঁটায় যেন থাকে সমতা ও মর্যাদার গ্যারান্টি।

(লেখক: আইনজীবী এবং উন্নয়নকর্মী)

Read full story at source