মোটরসাইকেলচালকদের দিন কেমন কাটছে
· Prothom Alo

সরেজমিন ঘুরে রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে।
বিকেল গড়িয়ে প্রায় সন্ধ্যা। রাজধানীর বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন এলাকায় তখন মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি। একটির পর একটি বাইক, সামনে এগোয় ধীরে ধীরে। সেই সারিতে দাঁড়িয়ে আছেন রাশেদ মোশারফ।
Visit betsport.cv for more information.
রাশেদ অ্যাপে রাইড শেয়ার করেন। সাত বছর আগে ভালো আয়ের আশায় গাইবান্ধার গ্রামের বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় আসেন। স্ত্রী ও দুই ছেলেকে রেখে আসেন গ্রামে। মিরপুর ২ নম্বর সেকশনে বোনের সঙ্গে থাকেন। দিনের বেশির ভাগ সময় রাশেদের কেটে যায় শহরের রাস্তায় রাস্তায়, যাত্রীর খোঁজে।
রাশেদ মোশারফ, ভাড়ায় মোটরসাইকেলচালকতেলের সংকটে আয় অর্ধেক হইয়া গেছে। আগে দিনে ১ হাজার ২০০ থেইকা দেড় হাজার টাকা কামাইতাম। এখন ৭০০–৮০০ টাকার বেশি আয় হয় না।গতকাল শনিবার বিকেল সাড়ে চারটার দিকে রাশেদ মোশারফের সঙ্গে কথা হয় এই প্রতিবেদকের। জানান, বেলা দুইটার দিকে লাইনে দাঁড়িয়েছেন। আড়াই ঘণ্টা পেরিয়ে গেলেও সামনে তখনো অর্ধশতাধিক মোটরসাইকেল। তাঁকে আরও এক থেকে দেড় ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হবে।
রাশেদ বলছিলেন, ‘তেলের এই সংকটে আয় অর্ধেক হইয়া গেছে। আগে দিনে ১ হাজার ২০০ থেইকা দেড় হাজার টাকা কামাইতাম। এখন ৭০০–৮০০ টাকার বেশি আয় হয় না।’ জানালেন, পৌনে দুইটার দিকে নাখালপাড়ায় এক যাত্রী নামিয়ে সরাসরি লাইনে এসে দাঁড়িয়েছেন। সকাল থেকে পাঁচজন যাত্রী পেয়েছিলেন। মোটামুটি ৯০০ টাকা আয় করেছেন। কিন্তু বাইকের তেল প্রায় শেষ হয়ে গিয়েছিল, তাই আর চালাতে পারেননি।
রাশেদ প্রথম আলোকে বলেন, ‘তেলের লাইগা গাড়ি চালাইতে পারি না। এইডাই সব থেইকা বড় সমস্যা। তেল নিতে গেলে ঘণ্টার পর ঘণ্টা লাইনে দাঁড়ায় থাকা লাগে। এই টাইমটা তো কামকাজ বন্ধই থাকে। আবার অফিস ছুটির টাইমে ভাড়া ভালো মেলে। কিন্তু ওই টাইমেও তেলের লাইনে দাঁড়ায় থাকা লাগে।’
শুক্রবারের অভিজ্ঞতা জানিয়ে রাশেদ বলেন, ‘পরীবাগের (মেঘনা ফিলিং স্টেশন) তিন ঘণ্টা লাইনে দাঁড়াইয়া তেল কিনছি গতকাল। কিন্তু তেল পাইছি মাত্র পাঁচ লিটার। ট্যাংকি ভইরা তেল পাইলে আজকে আর কষ্ট করা লাগত না।’ ঈদে গ্রামে পরিবারের কাছে যেতে পারেননি জানিয়ে তিনি বলেন, ‘পকেটে তেমন টাকাপয়সা আছিল না। হাতে টাকা নাই দেইখা নিজেও বাড়ি যাই নাই। বাড়িতে বেশি টাকাও পাঠাইতে পারি নাই।’
রাশেদের বড় ছেলে তাহজিদ এবার উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার্থী। ছোট ছেলে তানজিদ পড়ে অষ্টম শ্রেণিতে। স্ত্রী গৃহিণী। পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ তিনিই। সাধারণ সময়ে সপ্তাহে অন্তত দুবার আড়াই থেকে তিন হাজার টাকা বাড়িতে পাঠান। কিন্তু ঈদের আগে সেই ধারাবাহিকতা রাখতে পারেননি। ঈদের পর গত শুক্রবার কিছু টাকা পাঠিয়েছেন বলে জানালেন।
পরে সন্ধ্যা সাড়ে ছয়টার দিকে মুঠোফোনে কথা হয় রাশেদের সঙ্গে। প্রায় চার ঘণ্টা পর ৫টা ৫০ মিনিটে তিনি তেল পেয়েছেন বলে জানান। তখন তিনি ফার্মগেটে যাত্রীর অপেক্ষায় ছিলেন।
তেলের জন্য অপেক্ষা চলছেই
গতকাল রাজধানীর বিভিন্ন ফিলিং স্টেশনে তেলের জন্য মোটরসাইকেলের দীর্ঘ সারি দেখা গেছে। মিরপুরের কালশীর সুমাত্রা ফিলিং স্টেশন, বিজয় সরণির ট্রাস্ট ফিলিং স্টেশন এবং পরীবাগের মেঘনা মডেল ফিলিং স্টেশনে সারি ছিল চোখে পড়ার মতো। এই পাম্পগুলোতে মোটরসাইকেলের সারিতে দেড় থেকে দুই শতাধিক চালক দাঁড়িয়ে ছিলেন তেলের জন্য। এই তিন পাম্পে ৯ জন মোটরসাইকেলচালকের সঙ্গে কথা বলেছেন এই প্রতিবেদক। সবাই অ্যাপে রাইড শেয়ার করে জীবিকা নির্বাহ করেন।
গতকাল সকালে চারটি পাম্প ঘুরেও তেল পাননি বলে জানিয়েছেন অ্যাপে রাইড শেয়ারের আরেক মোটরসাইকেলচালক রেজাউর রশিদ। বিকেলে ট্রাস্ট পাম্পে কথা হয় এই চালকের সঙ্গে। জানালেন, গত শুক্রবার বিকেলে তিন ঘণ্টা অপেক্ষা করে মহাখালীর একটি পাম্প থেকে ৪০০ টাকার তেল পেয়েছিলেন তিনি। পরে রাত ৯টার দিকে গিয়েছিলেন মহাখালীর ইউরেকা ফিলিং স্টেশনে। কিন্তু তিনি সারিতে অপেক্ষায় থাকার সময় সোয়া ১০টার দিকে ওই পাম্পের তেল ফুরিয়ে যায়।
বিকেলে ট্রাস্ট পাম্পের দায়িত্বে থাকা ইনচার্জ মোহাম্মদ শরীফ প্রথম আলোকে বলেন, সকাল ছয়টার দিকে তাঁদের পাম্পের তেল শেষ হয়ে গিয়েছিল। পরে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে তেলের গাড়ি আসে। তাঁরা বেলা সোয়া একটার দিকে বিক্রি শুরু করেন। শুরুতে অকটেন ৪০ হাজার ৫০০ লিটার ও ডিজেল ৯ হাজার লিটার ছিল বলেও জানান তিনি।
বিআরটিসির গাড়ির চালক শরীফুল ইসলামদুপুর ১২টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। সাড়ে তিন ঘণ্টা হয়ে গেল, সামনে এখনো অনেক গাড়ি। সব কটি গাড়ি অকটেন নেবে। ডিজেলের গাড়ি নেই। পাম্পে ডিজেল বিক্রির দুটি নজেল ফাঁকা আছে। আমরা বলেছিলাম আমাদের অন্য লাইনে দিয়ে তেল দিতে। কিন্তু দেয়নি।সামনে এখনো অনেক গাড়ি
গতকাল বেলা তিনটার দিকে মিরপুরের সুমাত্রা ফিলিং স্টেশনে বিআরটিসির দ্বিতল যাত্রীবাহী বাসগুলোকে তেলের সারিতে অপেক্ষা করতে দেখা গেছে। ওই সময় বিআরটিসির ১১টি বাসের পাশাপাশি কয়েকটি যাত্রীবাহী বাস ও কিছু কাভার্ড পিকআপ ভ্যানের চালকদেরও তেলের অপেক্ষায় দাঁড়িয়ে থাকতে দেখা যায়।
বেলা সাড়ে তিনটার দিকে বিআরটিসির একটি গাড়ির চালক শরীফুল ইসলাম বলেন, ‘দুপুর ১২টায় এসে লাইনে দাঁড়িয়েছি। সাড়ে তিন ঘণ্টা হয়ে গেল, সামনে এখনো অনেক গাড়ি। সব কটি গাড়ি অকটেন নেবে। ডিজেলের গাড়ি নেই। পাম্পে ডিজেল বিক্রির দুটি নজেল ফাঁকা আছে। আমরা বলেছিলাম আমাদের অন্য লাইনে দিয়ে তেল দিতে। কিন্তু দেয়নি।’