ইরানে স্থল অভিযানের পরিকল্পনা কত দূর এগিয়েছে ট্রাম্প প্রশাসনের

· Prothom Alo

ইরানে কয়েক সপ্তাহব্যাপী স্থল অভিযানের পরিকল্পনা করছে পেন্টাগন। মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, এরই মধ্যে কয়েক হাজার সেনা মধ্যপ্রাচ্যে পৌঁছাতে শুরু করেছেন। প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প এই পরিকল্পনায় সায় দিলে যুদ্ধ এক নতুন এবং অনেক বেশি ঝুঁকিপূর্ণ পর্যায়ে প্রবেশ করবে।

Visit sportbet.reviews for more information.

নাম প্রকাশ না করার শর্তে ওই মার্কিন কর্মকর্তারা বলেন, সম্ভাব্য কোনো স্থল অভিযান পূর্ণমাত্রার হবে না। বরং বিশেষ বাহিনী ও পদাতিক সেনাদের সমন্বয়ে দ্রুত অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনা করা হচ্ছে। সপ্তাহের পর সপ্তাহ ধরে এই পরিকল্পনা তৈরি হচ্ছে বলেও তাঁরা উল্লেখ করেছেন।

এ ধরনের অভিযানে মার্কিন সেনারা ইরানি ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র, সরাসরি গোলাগুলি এবং বিস্ফোরকসহ নানা ধরনের প্রাণঘাতী ঝুঁকির মুখে পড়তে পারেন। ট্রাম্প পেন্টাগনের পরিকল্পনাগুলো পুরোপুরি নাকি আংশিক অনুমোদন দেবেন, নাকি প্রত্যাখ্যান করবেন—তা এখনো স্পষ্ট হওয়া যায়নি।

বিশেষ বাহিনী ও পদাতিক সেনাদের সমন্বয়ে দ্রুত অভিযানের পরিকল্পনা করা হচ্ছে। তবে এটি পূর্ণমাত্রার সামরিক অভিযান হবে না।

ট্রাম্প প্রশাসন সম্প্রতি পরস্পরবিরোধী বার্তা দিয়ে আসছে। একদিকে যুদ্ধ গুটিয়ে নেওয়ার কথা বলা হচ্ছে, অন্যদিকে আরও কঠোর পদক্ষেপের হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

হোয়াইট হাউসের মুখপাত্র ক্যারোলাইন লেভিট গত মঙ্গলবার বলেছেন, তেহরান পারমাণবিক কর্মসূচি নিয়ে উচ্চাভিলাষী পরিকল্পনা ত্যাগ না করলে এবং যুক্তরাষ্ট্রের বিরুদ্ধে হুমকি বন্ধ না করলে ট্রাম্প তাদের জন্য ‘নরকের দুয়ার খুলে দিতে’ প্রস্তুত।

তবে এই প্রতিবেদনের জন্য করা এক প্রশ্নের জবাবে লেভিট বলেন, পেন্টাগনের কাজই হলো সম্ভাব্য সব ধরনের প্রস্তুতি রাখা, যাতে কমান্ডার ইন চিফ (প্রেসিডেন্ট) পরিস্থিতির প্রয়োজনে যেকোনো বিকল্প বেছে নিতে পারেন। তবে এর মানে এই নয়, প্রেসিডেন্ট এখনই চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলেছেন।

মার্কিন কর্মকর্তারা বলেছেন, এক মাস ধরে প্রশাসনের অভ্যন্তরীণ আলোচনায় পারস্য উপসাগরে ইরানের প্রধান তেল রপ্তানি কেন্দ্র খারগ দ্বীপ দখল করার বিষয়টি গুরুত্ব পাচ্ছে। এ ছাড়া হরমুজ প্রণালির কাছে উপকূলীয় এলাকাগুলোতে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে বাণিজ্যিক ও সামরিক জাহাজে হামলা চালাতে সক্ষম ইরানি সমরাস্ত্রগুলো খুঁজে বের করে ধ্বংস করার পরিকল্পনাও রয়েছে।

গত এক মাসে ইরাক, কুয়েত ও সৌদি আরবে পৃথক হামলায় ১৩ জন মার্কিন সেনা নিহত এবং ৩০০ জনের বেশি আহত হয়েছেন।

অভিযানের সময়সীমা নিয়ে কর্মকর্তাদের মধ্যে ভিন্নমত পাওয়া গেছে। একজন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, এসব লক্ষ্য পূরণ করতে কয়েক মাস নয়, বরং কয়েক সপ্তাহ সময় লাগতে পারে। তবে অন্য এক কর্মকর্তার মতে, এই অভিযান সম্পন্ন করতে ‘মাস দুয়েক’ সময় লাগার সম্ভাবনা আছে।

পেন্টাগনের কাছে এ বিষয়ে মন্তব্য জানতে চাওয়া হলেও তারা সাড়া দেয়নি।

যুদ্ধের ক্রমবর্ধমান অর্থনৈতিক প্রভাবে উদ্বিগ্ন মার্কিন মিত্রদের নিয়ে ফ্রান্সে এক বৈঠক শেষে গত শুক্রবার সাংবাদিকদের মুখোমুখি হন পররাষ্ট্রমন্ত্রী মার্ক রুবিও। তিনি আশ্বস্ত করে বলেন, ‘এই সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হবে না।’

প্রশাসনের নিয়মিত কিন্তু অস্পষ্ট মূল্যায়নের পুনরাবৃত্তি করে রুবিও দাবি করেন, নির্ধারিত সময়ের আগেই ইরান অভিযানের সাফল্য এসেছে। স্থলসেনা মোতায়েন ছাড়াই যুক্তরাষ্ট্র তার সব লক্ষ্য অর্জনে সক্ষম।

এর আগে সংবাদমাধ্যম অ্যাক্সিওসের এক প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, পেন্টাগন ইরানের ওপর একটি ‘চূড়ান্ত আঘাত’ হানার প্রস্তুতি নিচ্ছে। এ হামলায় বড় ধরনের বোমাবর্ষণের পাশাপাশি স্থল বাহিনীকেও ব্যবহার করা হতে পারে।

এ ছাড়া অ্যাক্সিওস ও ওয়াল স্ট্রিট জার্নাল সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে জানিয়েছে, মধ্যপ্রাচ্যে নিয়োজিত মার্কিন বাহিনীর শক্তি বৃদ্ধি করতে প্রশাসন আরও ১০ হাজার অতিরিক্ত স্থল সেনা পাঠানোর কথা ভাবছে। তবে ওয়াশিংটন পোস্ট স্বতন্ত্রভাবে এই তথ্যের সত্যতা নিশ্চিত করতে পারেনি।

ট্রাম্প ২০ মার্চ সাংবাদিকদের বলেছিলেন, ‘আমি কোথাও সেনা পাঠাচ্ছি না। পাঠালেও আপনাদের বলতাম না, তবে পাঠাচ্ছি না।’

সরকারি কর্মকর্তাদের দেওয়া তথ্যমতে, মধ্যপ্রাচ্যে গত এক মাসে অন্তত ১৩ জন মার্কিন সেনা প্রাণ হারিয়েছেন। এর মধ্যে ইরাকে এক বিমান দুর্ঘটনায় ছয়জন এবং কুয়েতের শুয়াইবা বন্দরে ড্রোন হামলায় আরও ছয়জন নিহত হন। এ ছাড়া সৌদি আরবের প্রিন্স সুলতান বিমানঘাঁটিতে হামলায় এক সেনার মৃত্যু হয়েছে।

মধ্যপ্রাচ্যের অন্তত সাতটি দেশে থাকা মার্কিন স্থাপনাগুলোতে ইরানের ড্রোন ও ক্ষেপণাস্ত্র হামলায় ৩০০ জনের বেশি সেনা আহত হয়েছেন। কর্মকর্তাদের মতে, অন্তত ১০ জন সেনার আঘাত অত্যন্ত গুরুতর।

সাম্প্রতিক জনমত জরিপগুলো বলছে, ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন যুদ্ধসেনা মোতায়েনের বিষয়ে খোদ যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ মানুষের মধ্যে তীব্র বিরোধিতা রয়েছে। অ্যাসোসিয়েটেড প্রেস (এপি) এবং শিকাগো বিশ্ববিদ্যালয়ের ন্যাশনাল ওপিনিয়ন রিসার্চ সেন্টারের যৌথ জরিপ অনুযায়ী, ৬২ শতাংশ উত্তরদাতা ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর ঘোরবিরোধী। এই প্রস্তাবের পক্ষে মত দিয়েছেন মাত্র ১২ শতাংশ মানুষ।

রিপাবলিকানদের মধ্যেও বিভক্তি স্পষ্ট—একাংশ স্থল অভিযানের পক্ষে, আরেকাংশ কঠোর বিরোধী।

তবে ইরানের সামরিক লক্ষ্যবস্তুগুলোতে বিমান হামলা চালানোর বিষয়ে জনমত প্রায় সমানভাবে বিভক্ত। জরিপে দেখা গেছে, ৩৯ শতাংশ মানুষ বিমান হামলার বিপক্ষে থাকলেও এর পক্ষে সায় দিয়েছেন ৩৩ শতাংশ উত্তরদাতা।

ইরানের খারগ দ্বীপ দখলে সেখানে মার্কিন সেনা পাঠানো নিয়ে জনমনে ব্যাপক জল্পনা থাকলেও মাইকেল আইজেনস্ট্যাড বলেন, এটি অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ হতে পারে।

ইরাক, ইসরায়েল ও জর্ডানে কাজ করা এই অবসরপ্রাপ্ত সেনা কর্মকর্তার মতে, সরাসরি দ্বীপটি দখল করার চেয়ে এর চারপাশে মাইন বসিয়ে ইরানকে চাপে রাখা বেশি নিরাপদ হতে পারে। এর ফলে ইরানকে হরমুজ প্রণালিতে তাদের বসানো মাইনগুলো সরিয়ে নিতে বাধ্য করা সম্ভব হবে।

আইজেনস্ট্যাড বলেন, ‘ইরানের ড্রোন ও কামানের গোলার মুখে ছোট্ট ওই দ্বীপে আটকা পড়ে থাকাটা মোটেও সুখকর হবে না।’ এর পরিবর্তে ইরানের উপকূলীয় সামরিক ঘাঁটিগুলো নিশ্চিহ্ন করে ফেলাই হবে অনেক বেশি বুদ্ধিমানের কাজ।

আইজেনস্ট্যাড আরও বলেন, দীর্ঘ সময়ের জন্য সেনাদের এক জায়গায় রাখা ঠিক হবে না। সেনাদের সুরক্ষা নিশ্চিত করতে ঝটিকা অভিযান চালিয়ে দ্রুত ভেতরে আসতে হবে।

ইতিমধ্যে প্রায় ২ হাজার ২০০ নৌ ও মেরিন সেনা নিয়ে গঠিত ৩১তম মেরিন এক্সপেডিশনারি ইউনিটকে মধ্যপ্রাচ্যে যাওয়ার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। এই ইউনিটের অভিযান চালানোর সক্ষমতা থাকলেও অতিরিক্ত রসদ সরবরাহ ছাড়া তারা কতক্ষণ লড়াই চালিয়ে যেতে পারবে, তা নিয়ে সংশয় প্রকাশ করেছেন ইউনিটের কার্যক্রম সম্পর্কে অবগত এক অবসরপ্রাপ্ত ঊর্ধ্বতন সামরিক কর্মকর্তা।

এক অবসরপ্রাপ্ত সামরিক কর্মকর্তা বলেন, পারস্য উপসাগরে ইরানের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ভূখণ্ড খারগ দ্বীপ। তবে মার্কিন সামরিক কর্মকর্তারা হরমুজ প্রণালির কাছাকাছি অবস্থিত ইরানের অন্য দ্বীপগুলোকেও সম্ভাব্য অভিযানের লক্ষ্যস্থল হিসেবে পর্যবেক্ষণ করছেন।

ওই কর্মকর্তা আরও সতর্ক করেছেন, ইরানের ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড কোর (আইআরজিসি) সম্ভবত সেখানে মরণপণ লড়াই করবে। এমনকি মার্কিন বাহিনীকে ঠেকাতে তারা খারগ দ্বীপের মূল্যবান তেল অবকাঠামোকেও ঢাল হিসেবে ব্যবহার করতে পারে।

মার্কিন স্থল অভিযানের পরিকল্পনা সম্পর্কে অবগত অন্য এক সাবেক ঊর্ধ্বতন প্রতিরক্ষা কর্মকর্তা বলেছেন, ‘এই পরিকল্পনা অত্যন্ত ব্যাপক। আমরা বিষয়টি নিয়ে গভীরভাবে কাজ করেছি এবং সম্ভাব্য সব ধরনের যুদ্ধের মহড়া চালানো হয়েছে। এটি কোনো শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতি নয়।’

ওই কর্মকর্তার মতে, ইরানের ভূখণ্ড দখল করা হলে তেহরান সরকার যেমন বিব্রত হবে, তেমনি ভবিষ্যতে আলোচনার টেবিলে এটি যুক্তরাষ্ট্রের জন্য একটি শক্তিশালী তুরুপের তাস হিসেবে কাজ করবে। তবে সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হবে দখল করা এলাকায় মার্কিন সেনাদের সুরক্ষা দেওয়া।

ডেমোক্র্যাটরা শুরু থেকেই ইরানের বিরুদ্ধে এই যুদ্ধের বিরোধিতা করে এলেও রিপাবলিকান শিবিরের চিত্র ভিন্ন। প্রেসিডেন্ট ট্রাম্পের নিজের দলের আইনপ্রণেতাদের মধ্যেই স্থল অভিযানের বিষয়ে চরম মতভেদ দেখা দিয়েছে।

উইসকনসিন থেকে নির্বাচিত রিপাবলিকান প্রতিনিধি ও সাবেক নেভি সিল ডেরেক ভ্যান অর্ডেন গত বৃহস্পতিবার সাংবাদিকদের সাফ জানিয়ে দিয়েছেন, তিনি ইরানি ভূখণ্ডে মার্কিন সেনা পাঠানোর ঘোর বিরোধী।

ট্রাম্পের কট্টর সমর্থক হিসেবে পরিচিত এই নেতা বলেন, ‘শুরু থেকেই এ বিষয়ে আমার অবস্থান শতভাগ পরিষ্কার। স্থলসেনা ছাড়াই ডোনাল্ড ট্রাম্প তাঁর কৌশলগত লক্ষ্যগুলো অর্জন করতে পারেন।’

একই সুরে দক্ষিণ ক্যারোলাইনার রিপাবলিকান প্রতিনিধি ন্যান্সি মেস সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে বলেছেন, ইরানে স্থলসেনা পাঠানোর প্রস্তাব তিনি সমর্থন করবেন না।

তবে রিপাবলিকানদের অন্য একটি অংশ প্রেসিডেন্টকে যুদ্ধের পথে আরও এগিয়ে যাওয়ার আহ্বান জানাচ্ছে। সিনেটর লিন্ডসে গ্রাহাম সরাসরি খারগ দ্বীপ দখলের পক্ষে মত দিয়েছেন। গত সপ্তাহে ফক্স নিউজকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময় আইও জিমা দ্বীপ দখলের উদাহরণ টেনে বলেন, ‘আমরা যদি আইও জিমা জয় করতে পারি, তবে এটিও পারব। আমার বাজি সব সময় মেরিন সেনাদের ওপর।’

আইও জিমা যুদ্ধে প্রায় ৬ হাজার ৮০০ মার্কিন সেনা নিহত হয়েছিলেন। এমন ভয়াবহ যুদ্ধের সঙ্গে তুলনা করায় উভয় দলের আইনপ্রণেতাদের তোপের মুখে পড়েছেন গ্রাহাম।

Read full story at source