ভিঞ্চির ৫০০ বছরের পুরোনো রহস্যের জট খুললেন এক ডেন্টিস্ট

· Prothom Alo

মোনালিসার স্রষ্টা লিওনার্দো দা ভিঞ্চি মানেই যেন শিল্প ও বিজ্ঞানের এক জাদুকরী মিলন। নিজের সময়ের চেয়ে এগিয়ে থাকা এই প্রতিভাবান ইতালীয় শিল্পী ১৪৯০ সালে এঁকেছিলেন তাঁর আরেক বিখ্যাত মাস্টারপিস—ভিট্রুভিয়ান ম্যান। ড্যান ব্রাউনের দ্য ডা ভিঞ্চি কোড বইয়ের সাহায্যে এই ছবি আরও জনপ্রিয়তা পায়। এই বইয়ে ভিট্রুভিয়ান ম্যানের ছবি ব্যবহার করেন ড্যান ব্রাউন।

Visit saltysenoritaaz.com for more information.

একটি বৃত্ত এবং চতুর্ভুজের ঠিক মাঝখানে হাত-পা ছড়িয়ে দাঁড়িয়ে থাকা এক নিখুঁত মানবদেহের এই ছবিটি হয়তো অনেকেই দেখেছেন। রোমান স্থপতি ভিট্রুভিয়াসের লেখা থেকে অনুপ্রাণিত হয়ে ভিঞ্চি এই ছবিটিতে মানুষের শরীরের সবচেয়ে নিখুঁত অনুপাত তুলে ধরেছিলেন। কিন্তু এই হাত ও পায়ের দূরত্বের মাপ তিনি ঠিক কোন জ্যামিতিক নিয়মে নিয়েছিলেন, তা গত ৫০০ বছর ধরে বিজ্ঞানীদের কাছে বিশাল রহস্য হয়েই ছিল।

অনেকেই ভাবতেন, ভিঞ্চি হয়তো গোল্ডেন রেশিও ব্যবহার করেছেন। কিন্তু নিখুঁতভাবে মাপতে গেলে সেই অনুপাতের সঙ্গে ছবির মাপ কিছুতেই মিলত না। অবশেষে এই অর্ধসহস্রাব্দের পুরোনো রহস্যের জট খুলেছেন লন্ডনের এক ডেন্টিস্ট!

২০২৫ সালে জার্নাল অফ ম্যাথমেটিকস অ্যান্ড দ্য আর্টস নামে একটি বিজ্ঞান সাময়িকীতে রোরি ম্যাকসুইনি নামে ওই ডেন্টিস্ট একটি গবেষণাপত্র প্রকাশ করেন। তিনি দাবি করেন, এই বিশাল জ্যামিতিক রহস্যের সমাধান আসলে ভিট্রুভিয়ান ম্যানের ড্রয়িংয়ের ঠিক মাঝখানেই সবার চোখের সামনে লুকিয়ে ছিল!

০.৯৯৯...এবং ১ কি সমান
প্রতিভাবান ইতালীয় শিল্পী লিওনার্দো দা ভিঞ্চি ১৪৯০ সালে এঁকেছিলেন তাঁর আরেক বিখ্যাত মাস্টারপিস—ভিট্রুভিয়ান ম্যান। ড্যান ব্রাউনের দ্য ডা ভিঞ্চি কোড বইয়ের সাহায্যে এই ছবি আরও জনপ্রিয়তা পায়।

ম্যাকসুইনি ছবিটিতে মানুষের দুই পায়ের ঠিক মাঝখানের অংশে একটি নিখুঁত সমবাহু ত্রিভুজের সন্ধান পান। সমবাহু ত্রিভুজ মানে যে ত্রিভুজের তিনটি বাহু সমান। ভিঞ্চি নিজেই তাঁর ড্রয়িংয়ের নোটে লিখে গিয়েছিলেন, ‘তুমি যদি তোমার পা দুটির মাঝে ফাঁক করো...এবং হাত দুটি এমনভাবে তোলো যেন প্রসারিত আঙুলগুলো মাথার ওপরের লাইন স্পর্শ করে... তবে দুই পায়ের মাঝখানের ওই ফাঁকা জায়গাটি একটি সমবাহু ত্রিভুজ তৈরি করবে।’

ম্যাকসুইনি যখন এই ত্রিভুজটি নিয়ে অঙ্কের হিসাব কষতে বসলেন, তখন এক জাদুকরী ফলাফল বেরিয়ে এল। তিনি দেখলেন, ছবিতে মানুষটির দুই পায়ের ছড়িয়ে থাকা দূরত্বের সঙ্গে তার নাভি পর্যন্ত উচ্চতার অনুপাত হলো প্রায় ১.৬৪ থেকে ১.৬৫।

গণিতের দুনিয়ায় এই সংখ্যাটি ভীষণ পরিচিত এবং বিশেষ একটি সংখ্যা। এটি হলো টেট্রাহেড্রাল অনুপাত, যার মান ১.৬৩৩। এই জ্যামিতিক আকারটি ১৯১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আবিষ্কৃত হয়।

টেট্রাহেড্রাল

সহজ কথায়, আপনি যদি কয়েকটি গোলক সবচেয়ে নিখুঁত এবং সবচেয়ে কম জায়গা ব্যবহার করে একটি পিরামিড আকারে সাজাতে চান, তবে তাদের উচ্চতা এবং ভূমির অনুপাত হবে ঠিক ১.৬৩৩!

চতুর্থ মাত্রায় কি গিট দেওয়া সম্ভব
টেট্রাহেড্রাল অনুপাতের মান ১.৬৩৩। এই জ্যামিতিক আকারটি ১৯১৭ সালে আনুষ্ঠানিকভাবে আবিষ্কৃত হয়।

একজন ডেন্টিস্ট কীভাবে এই রহস্য ভেদ করলেন, এমন প্রশ্ন জাগা অস্বাভাবিক নয়। আসলে চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই একই অনুপাতের দারুণ একটি ব্যবহার আছে, যা ডেন্টিস্টরা খুব ভালো করেই জানেন। ১৮৬৪ সালে মানুষের চোয়ালের সবচেয়ে নিখুঁত ও কার্যকর অবস্থান বোঝার জন্য বনউইল ট্রায়াঙ্গেল নামে একটি জ্যামিতিক ধারণা আবিষ্কৃত হয়। অবাক করা ব্যাপার হলো, মানুষের চোয়ালের এই নিখুঁত ত্রিভুজের অনুপাতও ঠিক ১.৬৩৩! ম্যাকসুইনি যেহেতু পেশায় ডেন্টিস্ট, তাই এই সংখ্যাটি দেখেই তাঁর মাথায় হয়তো বুদ্ধির বাতি জ্বলে উঠেছিল।

বনউইল ট্রায়াঙ্গেল

ম্যাকসুইনি মনে করেন, এটি কোনোভাবেই কাকতালীয় ঘটনা নয়। প্রকৃতির খনিজ পদার্থ, স্ফটিক থেকে শুরু করে জীববিজ্ঞানের বিভিন্ন নিখুঁত গঠনে এই টেট্রাহেড্রাল জ্যামিতির দেখা মেলে, যা যেকোনো জিনিসের যান্ত্রিক দক্ষতা সবচেয়ে বাড়িয়ে দেয়।

তাঁর মতে, আমাদের মানবদেহও হয়তো মহাবিশ্বের এই নিখুঁত জ্যামিতিক নিয়ম মেনেই বিবর্তিত হয়েছে। আর লিওনার্দো দা ভিঞ্চির মতো ক্ষণজন্মা জিনিয়াস হয়তো ৫০০ বছর আগেই কোনো এক জাদুকরী স্বজ্ঞায় মহাবিশ্বের এই চিরন্তন গাণিতিক সত্যটি বুঝতে পেরেছিলেন! ভিট্রুভিয়ান ম্যান শুধু একজন মানুষের ছবি নয়, এটি হয়তো প্রকৃতির এক নিখুঁত জ্যামিতিক নকশা, যা ভিঞ্চি তাঁর ক্যানভাসে বন্দী করে গেছেন।

লেখক: ফ্রন্টেন্ড ডেভলপার, সফটভেঞ্চসূত্র: সায়েন্স অ্যালার্টজুতার ফিতা বাঁধার জ্যামিতি!

Read full story at source