ফেনীতে কারা কাটছে কৃষিজমির মাটি, দ্বন্দ্ব–সংঘাত থেকে কেন খুন

· Prothom Alo

ফেনীর বিভিন্ন উপজেলায় রাতের আঁধারে ফসলি জমির উর্বর মাটি কেটে শতাধিক ইটভাটায় নেওয়া হচ্ছে। এতে দ্রুত কমছে আবাদি জমি, তৈরি হচ্ছে পরিবেশের ঝুঁকি। মাটির ব্যবসা ঘিরে বাড়ছে সংঘর্ষ, অগ্নিসংযোগ ও রাজনৈতিক কোন্দল। প্রশাসন অভিযান চালালেও সুফল মেলেনি বলে অভিযোগ স্থানীয় ব্যক্তিদের।

Visit sportbet.rodeo for more information.

ফেনীতে কৃষিজমির সুরক্ষা আইন ভঙ্গ করে ছয় উপজেলা থেকে রাতের অন্ধকারে মাটি কেটে পাচার করা হচ্ছে শতাধিক ইটভাটায়। এতে কৃষিজমি উর্বরতা হারাচ্ছে। কেবল কৃষিজমি নয়, খাসজমি, খাল ও নদীর তীর থেকেও মাটি কাটা হচ্ছে। প্রতিদিন সন্ধ্যার পর শুরু হয়ে ভোর পর্যন্ত চলে মাটি কাটার কাজ। রাতের অন্ধকারে শত শত ট্রাক–পিকআপ দিয়ে এসব মাটি পরিবহন করা হয়।

মাটির ব্যবসায় ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দল ও সহযোগী সংগঠনের একাধিক নেতা-কর্মীর নাম উঠে এসেছে। ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ ধরে রাখতে দ্বন্দ্বে জড়াচ্ছেন তাঁরা। ঘটছে খুন ও অপহরণের মতো ঘটনা। অনেকের বিরুদ্ধে সাংগঠনিক ব্যবস্থাও নেওয়া হয়েছে। এরপরও মাটি কাটা ও পাচার বন্ধ হয়নি।

এক ইউনিয়নের অর্ধেক জমিতে কোদাল

সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নে ৯টি ওয়ার্ড ও ১৮টি গ্রাম রয়েছে। ইউনিয়নে কৃষিজমি রয়েছে ১ হাজার ৪০০ হেক্টর। সম্প্রতি ইউনিয়নের মাথিয়ারা, উত্তর ডমুরুয়া, দক্ষিণ ডমুরুয়া, ছোট ধলিয়া, লক্ষ্মীয়ারা, বগইড়, ভাস্কর, ইলাশপুর, উত্তর কাশিমপুর, দক্ষিণ কাশিমপুর, রতনপুর, বিরলী ও জগইরগাঁও গ্রামে ঘুরে কৃষিজমির মাটি কাটতে দেখা গেছে। এসব এলাকার মোট কৃষিজমির অর্ধেকেই কোদালের কোপ পড়েছে।

স্থানীয় কৃষক ও শ্যালো পাম্পের মালিক মোহাম্মদ পারভেজ বলেন, ফেনী উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন দিয়ে বয়ে গেছে করের ছড়া খাল। খালের এক পাশে বিরলী ও রতনপুর গ্রাম, অপর পাশে লক্ষ্মীয়ারা ও ভগবানপুর গ্রাম। গত মাসে মাটির ব্যবসায়ীরা করের ছড়া খালের ওপর দিয়ে মাটি ফেলে বাঁধ নির্মাণ করেন। ওই বাঁধের ওপর দিয়ে পাশের জমির মাটি কেটে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে। এতে খালের পানিপ্রবাহ বন্ধ হয়ে গেছে। স্থানীয় ব্যক্তিরা বিক্ষোভ করলে এলাকায় অভিযান পরিচালনা করেন সদর উপজেলা সহকারী কমিশনার (ভূমি)। অভিযানে কাউকে না পেয়ে ঘটনাস্থলে থাকা তিনটি এক্সক্যাভেটর মেশিন (খননযন্ত্র) জব্দ করেন তিনি। এ সময় তিনি অভিযুক্ত ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে মামলা করার ঘোষণা দেন।

সদর উপজেলার শুধু পাঁচগাছিয়া ইউনিয়ন নয়, শর্শদি, বালিগাঁও, ছনুয়া, কালীদহ, মোটবি, লেমুয়া, ফরহাদনগর, ধর্মপুর, কাজিরবাগ, ফাজিলপুর, ধলিয়া ইউনিয়নে দেদারে কৃষিজমির মাটি কাটা চলছে। জেলার অন্য পাঁচটি উপজেলায় একই চিত্র দেখা গেছে। দাগনভূঞা উপজেলার রাজাপুর, সিন্দুরপুর, রামনগর, জায়লস্কর, ইয়াকুবপুর ইউনিয়নে মাটি কাটার হার বেশি। এ ছাড়া ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর, শুভপুর, মহামায়া, রাধানগর ইউনিয়ন, সোনাগাজী উপজেলার মতিগঞ্জ, নবাবপুর, আমিরাবাদ ও মঙ্গলকান্দি ইউনিয়ন, ফুলগাজী উপজেলার ফুলগাজী সদর, আমজাদ হাট ও জিএম হাট, পরশুরাম উপজেলার চিথলিয়া ও বক্সমাহমুদ ইউনিয়ন প্রতি রাতেই মাটি কাটা চলছে।

গত ১৪ মার্চ রাতে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের পূর্ব শিলুয়া কন্ট্রাক্টর মসজিদসংলগ্ন এলাকায় সংঘর্ষে আবু আহাম্মদ (৩৭) নামের যুবদল কর্মী নিহত হন। এ সময় আহত হয়েছেন যুবদলের আরও দুই কর্মী। মাটির ব্যবসার দ্বন্দ্ব থেকে তিনি খুন হয়েছেন বলে নেতা-কর্মীদের দাবি।

ব্যবসার নিয়ন্ত্রণ নিয়ে সংঘাত

ফেনীতে মাটির ব্যবসা নিয়ে দ্বন্দ্বে গত তিন মাসে জেলার বিভিন্ন উপজেলায় হামলা, বাড়িতে অগ্নিসংযোগ, অপহরণ ও হত্যার ঘটনা ঘটেছে। তাঁদের মধ্যে যুবদলের এক কর্মীকে পিটিয়ে হত্যা, ছাত্রদলের এক নেতার বাড়িতে অগ্নিসংযোগ ও যুবদলের এক কর্মীকে অপহরণ করা হয়। এসব ঘটনায় জড়িত থাকায় ছাত্রদল ও যুবদলের একাধিক নেতাকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

গত ১৪ মার্চ রাতে ফেনীর ছাগলনাইয়া উপজেলার পাঠাননগর ইউনিয়নের পূর্ব শিলুয়া কন্ট্রাক্টর মসজিদসংলগ্ন এলাকায় সংঘর্ষে আবু আহাম্মদ (৩৭) নামের যুবদল কর্মী নিহত হন। এ সময় আহত হয়েছেন যুবদলের আরও দুই কর্মী। মাটির ব্যবসার দ্বন্দ্ব থেকে তিনি খুন হয়েছেন বলে নেতা–কর্মীদের দাবি।

মাটির ব্যবসার দ্বন্দ্বে ও চাঁদা দাবির প্রতিবাদ করায় ৩ এপ্রিল রাতে ফেনী সদর উপজেলার শর্শদি ইউনিয়নের উত্তর ফতেহপুর গ্রামে আলিয়া কামিল মাদ্রাসার ছাত্রদলের সভাপতি মোহাম্মদ সাইফুদ্দিন শিবলুর বাড়িতে আগুন দেয় দুর্বৃত্তরা। এ ঘটনায় দুটি ঘর পুড়ে যায়। আগুন দেওয়ার সঙ্গে জড়িত থাকার অভিযোগ ওঠায় শর্শদি ইউনিয়ন যুবদলের সমন্বয় কমিটির সদস্য জাফর আহমদ মানিককে ৪ এপ্রিল দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

ফেনীর পাঁচগাছিয়ার লক্ষ্মীয়ারা গ্রামে ফসলি জমির মাটি কেটে নেওয়া হয়। সেখানে এখন ডোবা সৃষ্টি হয়েছে। ৩১ মার্চ দুপুরে তোলা

২৫ মার্চ রাতে ফেনী সরকারি কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি ও রামপুর নাসির মেমোরিয়াল কলেজের এক নেতার মুঠোফোনে কথোপকথনের রেকর্ড ভাইরাল হয়। মাটির ব্যবসার জন্য চাঁদা দাবিসংক্রান্ত ওই কথোপকথনের জেরে ফেনী কলেজ ছাত্রদলের সভাপতি নোমানুল হককে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়েছে।

২৭ মার্চ রাতে সদর উপজেলার পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নের আজাদ ট্রেডার্সের মালিক যুবদল কর্মী আজাদকে অপহরণ করা হয় মাটির ব্যবসার বিরোধ থেকে। আজাদের কর্মী ও সমর্থকেরা ক্ষুব্ধ হয়ে ওই রাতে ফেনী-নোয়াখালী মহাসড়ক অবরোধ করলে পরে তাঁকে উদ্ধার করে পুলিশ।

ফেনী জেলা যুবদলের সভাপতি নাসির উদ্দিন খন্দকার বলেন, মাটি কাটার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় এ পর্যন্ত যুবদলের তিন নেতাকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রদলের এক নেতাকেও একই কারণে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।

নাসির উদ্দিন খন্দকার, সভাপতি, ফেনী জেলা যুবদল‘মাটি কাটার সঙ্গে সম্পৃক্ত থাকায় এ পর্যন্ত যুবদলের তিন নেতাকে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে। এ ছাড়া ছাত্রদলের এক নেতাকেও একই কারণে দল থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’

কী করছে প্রশাসন

মাটি কাটা রোধে তৎপর রয়েছে বলে দাবি করেছে জেলা ও উপজেলা প্রশাসন। জেলা প্রশাসন সূত্রে জানা যায়, গত ছয় মাসে মাটি কাটা বন্ধে ৮০টি ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে প্রশাসনের পক্ষ থেকে। এসব অভিযানে মামলা হয়েছে ৬৫টি। ১৮ জনকে বিভিন্ন মেয়াদে কারাদণ্ড দেওয়া হয়েছে। অভিযানে ৪২ লাখ ৫০ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। ১৫টি এক্সক্যাভেটর মেশিন জব্দ ও বিনষ্ট এবং ৩টি মাটিবাহী পিকআপ জব্দ করা হয়েছে।

মাটি কাটা রোধে সবচেয়ে বেশি অভিযান পরিচালিত হয়েছে ফেনী সদর উপজেলায়। এ উপজেলায় ২৫টি অভিযান হয়। এ ছাড়া ফুলগাজী উপজেলায় ২১টি, পরশুরাম উপজেলায় ১০, দাগনভূঞা উপজেলায় ১০, সোনাগাজী উপজেলায় ৯ ও ছাগলনাইয়া উপজেলায় ৫টি অভিযান পরিচালিত হয়েছে।

মাটি কাটা রোধে প্রশাসন সোচ্চার জানিয়ে জেলা প্রশাসক মনিরা হক বলেন, বাণিজ্যিক উদ্দেশ্যে ফসলি জমির টপসয়েল বিক্রি করা আইনিভাবে অপরাধ। এসব মাটি বিক্রি বন্ধে জেলা প্রশাসনের পক্ষ থেকে নিয়মিত ভ্রাম্যমাণ অভিযান চলমান। ফসলি জমির মাটির ক্ষেত্রে ক্রেতা-বিক্রেতা উভয়ই সমান অপরাধী। এ বিষয়ে কোনো পক্ষকেই ছাড় দেওয়া হচ্ছে না।

কৃষিজমির ক্ষতি

ফেনী সদর উপজেলার উপসহকারী কৃষি অফিসার মাহমুদুল করিম বলেন, ফসলি জমির উপরিভাগের ১০ থেকে ১২ ইঞ্চির মধ্যে মাটির জৈব উপাদান থাকে। সেই মাটি কাটার ফলে জমির জৈব উপাদান চলে যায়। এতে জমির স্থায়ী ক্ষতি হয়। তাই ফসলি জমির মাটি কাটা বেআইনি।

মাহমুদুল করিম আরও বলেন, পাঁচগাছিয়া ইউনিয়নে প্রায় ৩০০ হেক্টর কৃষিজমি পতিত থেকে যাচ্ছে। প্রতিবছর অনাবাদি জমির পরিমাণ বেড়েই চলেছে। এর মধ্যে মাটি ব্যবসায়ীদের দৌরাত্ম্যে খালেও প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি হয়েছে। এ কারণে চলতি বোরো মৌসুমে ১ হাজার ২০০ হেক্টর জমিতে চাষাবাদ করা সম্ভব হয়নি।

Read full story at source