ভুল থেকে আমি শিখেছি, নিয়মিত শেখা এবং আপডেট থাকা খুবই জরুরি: রাইসুল কবির

· Prothom Alo

তরুণ ও নবীন পেশাজীবীদের ক্যারিয়ার গঠনে বইয়ের শিক্ষার চেয়ে বেশি প্রয়োজন বাস্তব অভিজ্ঞতা থেকে পাওয়া সঠিক দিকনির্দেশনা। সেই প্রয়োজনীয়তা থেকেই লিগ্যাসি তৈরির পথে থাকা সফল তরুণদের স্বপ্ন, শেখার অভিজ্ঞতা আর ভুল থেকে ঘুরে দাঁড়ানোর গল্প নিয়ে প্রথম আলো ডটকম ও প্রাইম ব্যাংকের যৌথ উদ্যোগে বিশেষ পডকাস্ট শো: লিগ্যাসি উইথ এমআরএইচ: সিজন-২। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ব্যবসায় প্রশাসন ইনস্টিটিউটের অধ্যাপক মোহাম্মদ রিদওয়ানুল হকের সঞ্চালনায় একাদশতম পর্বে অতিথি হিসেবে অংশ নেন ‘ব্রেন স্টেশন ২৩ পিএলসি’র প্রতিষ্ঠাতা ও প্রধান নির্বাহী রাইসুল কবির। আলোচনার বিষয় ছিল ‘সততা অটুট রেখে কীভাবে গড়ে তোলা যায় সফল ও টেকসই প্রতিষ্ঠান?’

‘বর্তমান সময়ে শিক্ষার্থীদের উচিত ইউনিভার্সিটির প্রথম বা দ্বিতীয় বছর থেকেই আয়ের পথ খুঁজে বের করা। সেটা স্টার্টআপ হতে পারে, ফ্রিল্যান্সিং হতে পারে বা অন্য কোনো ইনকাম জেনারেটিং অ্যাকটিভিটি হতে পারে। অনেকেই শুধু টিউশন নিয়ে ব্যস্ত থাকে। এভাবে আয় করা যায় ঠিক; কিন্তু স্কিল বা দক্ষতা অর্জন করা যায় না। এই সময়ে তাদের এমন কিছুতে সময় দেওয়া উচিত, যেখান থেকে শেখাও হবে, আবার আয়ও হবে।’

পডকাস্ট শোতে অংশ নিয়ে কথাগুলো বলেন রাইসুল কবির। পর্বটি প্রচারিত হয় গত শনিবার (১১ এপ্রিল) প্রথম আলোর ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলোতে।

Visit chickenroadslot.lat for more information.

পডকাস্টের শুরুতেই সঞ্চালক জানতে চান, আপনাদের প্রতিষ্ঠানের নাম ‘ব্রেন স্টেশন ২৩’ রাখার কারণ কী?

উত্তরে রাইসুল কবির বলেন, ‘২০০৬ সালে যখন চারজন পার্টনার মিলে কাজ শুরু করি, তখন আমার পার্টনার রিয়াদ স্যার এবং মামুন ভাই ব্রেন স্টেশন নামটি পছন্দ করেছিলেন। কারণ, আমাদের স্বপ্ন ছিল, এটি হবে দেশসেরা মেধাবীদের একটি স্টেশন। আর “২৩” যুক্ত করার কারণ হলো, ঢাকার অক্ষাংশ বা ল্যাটিচিউড হচ্ছে ২৩ ডিগ্রি। এ ছাড়া আমি ছাত্র অবস্থায় “ল্যাটিচিউড ২৩” নামের একটি সংস্থায় কাজ করতাম, সেই কানেকশনটা বোঝাতেও আমরা ২৩ সংখ্যাটি ব্যবহার করি।’

প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, আপনার পার্টনারদের সঙ্গে পরিচয় কীভাবে হলো?

রাইসুল কবির বলেন, ‘আমি যখন ছাত্র ছিলাম, তখন থেকেই ল্যাটিচিউড ২৩-এর জন্য ফ্রিল্যান্সার হিসেবে বিভিন্ন সফটওয়্যার তৈরি করতাম। আমি তাঁদের অফিস ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার এবং একটি বড় ফ্ল্যাশ প্রজেক্ট সফলভাবে শেষ করে দিয়েছিলাম। আমার কাজ এবং ম্যানেজমেন্ট দক্ষতা দেখে মুগ্ধ হয়েই মূলত তাঁরা আমাকে সঙ্গে নিয়ে ব্রেন স্টেশন ২৩ শুরু করার প্রস্তাব দেন। এভাবেই আমাদের একে অপরের সঙ্গে পরিচয় ঘটে।’

ক্যারিয়ারের শুরুর দিকে আপনি বিনা পারিশ্রমিকেও কাজ করেছেন? এর কারণ ঠিক কী ছিল? সঞ্চালকের এমন প্রশ্নের উত্তরে রাইসুল কবির বলেন, ‘আমি ইন্টারমিডিয়েট পরীক্ষার পর বুয়েটে ভর্তি কোচিং করার সময়ই একটি কোম্পানিতে কাজ শুরু করি। সেখানে আমি মূলত ফ্রি কাজ করতাম। কারণ, আমার উদ্দেশ্য ছিল শেখা। আমি বুঝে গিয়েছিলাম, শুরুতে টাকা না পেলেও শেখাটা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।’

ব্রেন স্টেশন ২৩ কীভাবে একটি পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে পরিণত হলো? জানতে চাইলে রাইসুল কবির বলেন, ‘শুরুতে আমরা আলাদা কোনো কোম্পানি হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করিনি। প্রথম দুই বছর ল্যাটিচিউড ২৩-এর অধীন একটি প্রজেক্ট হিসেবেই কাজ চলছিল। পরে ২০০৮ সালে আমরা এটিকে পার্টনারশিপ ফার্ম হিসেবে রেজিস্ট্রেশন করি। এরপর ২০১৫ সালে প্রাইভেট লিমিটেড কোম্পানিতে রূপান্তর করি। পরবর্তী সময়ে যখন আমরা কর্মীদের মধ্যে শেয়ার দেওয়া শুরু করি এবং শেয়ারহোল্ডারের সংখ্যা ৩০-এর বেশি হয়ে যায়, তখন আইনগত কারণে এটিকে পাবলিক লিমিটেড কোম্পানিতে কনভার্ট করতে হয়।’

এরপর সঞ্চালক জানতে চান, কোম্পানির রূপান্তরের এই জার্নিতে তিনি কী কী শিখেছেন?

রাইসুল কবির বলেন, ‘স্পেসিফিক কোনো একটা জিনিস নিয়ে হয়তো বলা কঠিন। তবে কিছু গুরুত্বপূর্ণ বিষয় আছে, যেগুলো আমি এই জার্নিতে শিখেছি। কোম্পানি শুরু করার পরই বুঝতে পারি, এখানে অনেক কিছু শেখার আছে। তখনই আমি এমবিএ শুরু করি। এমবিএ করার সময় আমি মার্কেটিং, সেলস, এইচআর—এগুলো সম্পর্কে একটি পরিষ্কার ধারণা পাই।’

রাইসুল কবির আরও বলেন, ‘কোম্পানির রূপান্তরের এই জার্নিতে আমি বুঝতে পারি যে কোম্পানি একটা আলাদা এনটিটি, আর শেয়ারহোল্ডার আলাদা এনটিটি। এই পুরো বিষয়টা বুঝতে পারা আমার জন্য খুব ইন্টারেস্টিং ছিল। আরেকটি পারসোনাল দিক হলো, আমার মধ্যে একটু ইনফেরিওরিটি কমপ্লেক্স ছিল। এ কারণে আমি অনেক বই পড়তাম, বই পড়ে অনেক কিছু বোঝার চেষ্টা করতাম। এটিও জীবনে আমাকে অনেক সাহায্য করেছে।’

আপনার ক্যারিয়ারের এমন কোনো সিদ্ধান্ত কি আছে, যা এখন আপনার কাছে ভুল মনে হয়?

এমন প্রশ্নের উত্তরে রাইসুল কবির বলেন, ‘একটা সময় আমি গ্লোবাল মার্কেট নিয়ে খুব বেশি পড়াশোনা করিনি। বিশেষ করে বড় আইটি কোম্পানিগুলোর অ্যানুয়াল রিপোর্ট পড়ার অভ্যাস ছিল না। তখন আমার মনে হতো আউটসোর্সিং মার্কেট পুরোপুরি অন্য দেশের দখলে চলে গেছে। কিন্তু পরে বুঝতে পারি, বাস্তবতা ভিন্ন, মার্কেট আসলে অনেক বড় এবং সেখানে সুযোগও রয়েছে। এই ভুল থেকে আমি শিখেছি, নিয়মিত শেখা এবং আপডেট থাকা খুবই জরুরি।’

প্রসঙ্গক্রমে সঞ্চালক জানতে চান, ইনভেস্টরদের সঙ্গে কাজ করার অভিজ্ঞতা কেমন ছিল?

রাইসুল কবির বলেন, ‘সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হলো তাঁদের প্রত্যাশা বোঝা। তাঁরা যখন বিনিয়োগ করেন, তখন একটি নির্দিষ্ট রিটার্ন এবং এক্সিট প্ল্যান মাথায় রাখেন। আমাদের কাজ হলো সে বিষয়গুলো বিবেচনায় রেখে সিদ্ধান্ত নেওয়া। আমার ক্ষেত্রে, পার্টনারদের সঙ্গে নিয়মিত আলোচনা এবং আইডিয়া শেয়ার করা খুব কাজে দিয়েছে।’

রাইসুল কবির প্রায়ই বলেন বাংলাদেশের উদ্যোক্তারা বেশ ‘রোমান্টিক’। এ ধারণা ঠিক কেন হলো? সঞ্চালক জানতে চাইলে রাইসুল কবির বলেন, ‘এখানে রোমান্টিক বলতে আমি বোঝাতে চাই—আমাদের দেশের উদ্যোক্তাদের মধ্যে কাজের প্রতি প্যাশন অনেক বেশি। অনেক সময় তাঁরা কম আয় করেও কাজ চালিয়ে যান। কারণ, তাঁরা কাজটাকে ভালোবাসেন। বিশেষ করে সফটওয়্যার ইন্ডাস্ট্রিতে এমন অনেক উদ্যোক্তা আছেন, যাঁরা চাকরি করলে বেশি আয় করতে পারতেন, কিন্তু প্যাশন থেকেই উদ্যোক্তা হওয়ার পথ বেছে নিয়েছেন।’

আলোচনার শেষ পর্যায়ে সঞ্চালক জানতে চান, এআই বা কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার এই সময়ে ভবিষ্যতের জন্য কী ধরনের স্কিল সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?

উত্তরে রাইসুল কবির বলেন, ‘বর্তমানে এআইয়ের কারণে সবকিছু বেশ কনফিউজিং। তাই আমি সলিড কোনো অ্যাডভাইস দিতে না পারলেও কিছু বেসিক প্রিন্সিপাল বলতে পারি। সামনে শুধু সফটওয়্যার ডেভেলপার হলে চলবে না, বরং “প্রডাক্ট ওনার” হতে হবে; যিনি কাস্টমারের সমস্যা এন্ড-টু-এন্ড বুঝে সমাধান করতে পারেন।’

এ প্রসঙ্গে রাইসুল কবির আরও বলেন, ‘আমার পরামর্শ হলো, ইউনিভার্সিটির ফার্স্ট বা সেকেন্ড ইয়ার থেকে শুধু টিউশনি না করে ইনকাম প্রডিউসিং অ্যাকটিভিটিতে যুক্ত হতে হবে। এআইয়ের সাপোর্ট নিয়ে কোনো বিষয়ের আরও গভীরে ঢুকতে হবে। মনে রাখতে হবে, সামনে হয়তো কোটি কোটি প্রোগ্রামার লাগবে না, কিন্তু যাঁরা সার্ভার, ডেভঅপস এবং প্রোডাক্ট ম্যানেজমেন্ট বুঝবেন, তাঁদের চাহিদা থাকবে। এ ছাড়া হাইলি রেগুলেটেড কিছু বিশেষ ক্ষেত্র থাকবে, যেখানে এআই ব্যবহারের অনুমতি নেই, সেখানে সলিড প্রোগ্রামিং স্কিলের গুরুত্ব আগের মতোই থাকবে।’

Read full story at source