পাকিস্তানের ‘শাটল ডিপ্লোমেসি’ কতটা কাজে দেবে

· Prothom Alo

মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্পের সাম্প্রতিক বক্তব্য এবং পাকিস্তানের শীর্ষ নেতৃত্বের ‘শাটল ডিপ্লোমেসি’ বা দফায় দফায় কূটনৈতিক দৌড়ঝাঁপ একটি আশার আলো জাগিয়েছে। মনে হচ্ছে, আলোচনার মাধ্যমে ইরানের সঙ্গে ইসরায়েল ও যুক্তরাষ্ট্রের যুদ্ধ শেষ হতে পারে।

এ প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পদক্ষেপ হিসেবে হয়তো যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে একটি ‘ফ্রেমওয়ার্ক অ্যাগ্রিমেন্ট’ বা রূপরেখা চুক্তি সই হতে পারে, যা পরবর্তী সময়ে একটি চূড়ান্ত চুক্তির পথ সুগম করবে।

Visit sportbet.rodeo for more information.

গত বৃহস্পতিবার হোয়াইট হাউসে সাংবাদিকদের সামনে ট্রাম্প বেশ আশাবাদী সুরেই কথা বলেছেন। তিনি বলেন, যুদ্ধ এখন ‘শেষের পথে’; কারণ, ‘প্রায় সব’ সমস্যারই সমাধান হয়ে গেছে। অবশিষ্ট মতভেদগুলো নিয়ে শিগগিরই আলোচনা শুরু হবে। তিনি এমন ইঙ্গিতও দিয়েছেন, একটি চূড়ান্ত চুক্তি সই করতে তিনি প্রয়োজনে ইসলামাবাদ সফর করতে পারেন।

ট্রাম্পের অতিরঞ্জিত কথা বলার প্রবণতা থাকলেও এবার তাঁর বক্তব্যের পেছনে এই অঞ্চলে চলমান নিবিড় কূটনৈতিক তৎপরতার যোগসূত্র খুঁজে পাওয়া যায়। বিশেষ করে পাকিস্তানের সেনাপ্রধান ফিল্ড মার্শাল আসিম মুনিরের আকস্মিক তেহরান সফর ছিল অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ।

ধারণা করা হচ্ছে, তিনি ওয়াশিংটনের কোনো গুরুত্বপূর্ণ বার্তা নিয়েই ইরানের কর্মকর্তাদের সঙ্গে বৈঠক করতে গিয়েছিলেন। এটি মূলত ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে আরেকটি নতুন দফার আলোচনার জমি প্রস্তুত করারই ইঙ্গিত।

অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ বৈঠককে ‘ব্যর্থ’ বলে দাবি করলেও বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। কোনো জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান মাত্র কয়েক ঘণ্টায় হয়ে যাওয়া অসম্ভব। মূলত ইসলামাবাদ বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল এবং দুই পক্ষই নিজ নিজ দেশের নেতৃত্বের সঙ্গে পরামর্শের জন্য ফিরে যায়। কূটনৈতিক তৎপরতা থামেনি, বরং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষকে নমনীয় হওয়ার জন্য নেপথ্য আলোচনা জারি রয়েছে।

তেহরানে পাঠানো বার্তাগুলোর মূল লক্ষ্য ছিল বিদ্যমান অমীমাংসিত ইস্যুগুলোয় উভয় পক্ষের দূরত্ব কমিয়ে আনা এবং লেবাননে অস্ত্রবিরতির প্রচেষ্টা নিয়ে আলোচনা করা। একই সময়ে পাকিস্তানের প্রধানমন্ত্রী শাহবাজ শরিফ সৌদি আরব, কাতার ও তুরস্ক সফরে যান।

এই তিন মিত্রদেশের নেতাদের তিনি চলমান আলোচনার সর্বশেষ অগ্রগতি সম্পর্কে অবহিত করেন। এ থেকে স্পষ্ট, ওয়াশিংটন ও তেহরানের মধ্যে পুনরায় সরাসরি আলোচনার জন্য বড় মাপের প্রস্তুতি পুরোদমে চলছে।

৮ এপ্রিল থেকে যুক্তরাষ্ট্র, ইসরায়েল ও ইরানের মধ্যে যে যুদ্ধবিরতি চলছে, তা এখনো অটুট রয়েছে। এর মধ্যে লেবানন ও ইসরায়েলের মধ্যে ১০ দিনের যে যুদ্ধবিরতি ঘোষিত হয়েছে, তা এক বৃহত্তর শান্তিচুক্তির পথে বড় পদক্ষেপ হিসেবেই বিশ্বজুড়ে দেখা হচ্ছে। ইরান এ উদ্যোগকে স্বাগত জানিয়েছে।

ইরানের পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মুখপাত্র ইসমাইল বাঘাইয়ের ভাষ্য অনুযায়ী, তেহরান এ যুদ্ধবিরতিকে ওয়াশিংটনের সঙ্গে হওয়া বৃহত্তর সমঝোতারই একটি অংশ হিসেবে মনে করে, যেখানে পাকিস্তান মধ্যস্থতাকারী হিসেবে কাজ করেছে।

প্রকৃতপক্ষে এ প্রক্রিয়ার নেপথ্যে রয়েছে ১২ এপ্রিল ইসলামাবাদে যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে অনুষ্ঠিত উচ্চপর্যায়ের সরাসরি আলোচনা। চার দশকের বেশি সময় পর এই দুই বৈরী দেশের মধ্যে এমন উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়েছে।

ওই আলোচনায় দুই দেশেরই শক্তিশালী প্রতিনিধিদল পাঠানোর ঘটনাটি ইঙ্গিত দেয় যে উভয় পক্ষই এ সংঘাত থেকে উত্তরণের জন্য কতটা আন্তরিক।

যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে সম্ভাব্য শান্তি আলোচনাকে কেন্দ্র করে পাকিস্তানের রাজধানী ইসলামাবাদে নিরাপত্তা জোরদার করা হয়েছে। আজ শহরের আকাশে হেলিকপ্টারকে টহল দিতে দেখা যায়

অনেক আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এ বৈঠককে ‘ব্যর্থ’ বলে দাবি করলেও বাস্তব চিত্র কিছুটা ভিন্ন। কোনো জটিল ও দীর্ঘস্থায়ী সমস্যার সমাধান মাত্র কয়েক ঘণ্টায় হয়ে যাওয়া অসম্ভব। মূলত ইসলামাবাদ বৈঠকে ইতিবাচক আলোচনা হয়েছিল এবং দুই পক্ষই নিজ নিজ দেশের নেতৃত্বের সঙ্গে পরামর্শের জন্য ফিরে যায়। কূটনৈতিক তৎপরতা থামেনি, বরং পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় উভয় পক্ষকে নমনীয় হওয়ার জন্য নেপথ্য আলোচনা জারি রয়েছে।

ইসলামাবাদ বৈঠকটি উভয় দেশের অবস্থানের বড় ফারাকগুলো স্পষ্ট করে দিয়েছে। যুক্তরাষ্ট্র ১৫ দফা একটি পরিকল্পনা দিয়েছিল এবং বিপরীতে ইরান পেশ করেছিল ১০ দফা প্রস্তাব।

ইরানের প্রধান দাবিগুলোর মধ্যে রয়েছে তাদের বা তাদের মিত্রদের ওপর কোনো হামলার পুনরাবৃত্তি না হওয়া, সব নিষেধাজ্ঞা প্রত্যাহার, জব্দ করা সম্পদ ফিরিয়ে দেওয়া এবং ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি। অন্যদিকে যুক্তরাষ্ট্র চাইছে, ইরান যেন স্থায়ীভাবে পারমাণবিক অস্ত্র নির্মাণ থেকে বিরত থাকে এবং তাদের সমৃদ্ধ ইউরেনিয়ামের মজুত অন্য দেশে (যুক্তরাষ্ট্রে) পাঠিয়ে দেয়।

হরমুজ প্রণালির ওপর নিয়ন্ত্রণ ও বাণিজ্যিক জাহাজ চলাচলের বিষয়টি নিয়েও দ্বিমত রয়ে গেছে। এই কৌশলগত প্রণালি নিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের একটি রাজস্ব প্রস্তাব ইরান সরাসরি নাকচ করে দিয়েছে। আসন্ন দ্বিতীয় দফার আলোচনায় এই বিষয়গুলোই প্রাধান্য পাবে বলে ধারণা করা হচ্ছে। বিশেষ করে ইরান যে তার ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধ করার অধিকার চাইছে, যুক্তরাষ্ট্র তাতে শেষ পর্যন্ত সম্মতি দেয় কি না, সেটিই বড় প্রশ্ন।

ইরান যুদ্ধ যেভাবে শেষ হতে পারে

উভয় পক্ষই সম্ভবত যুদ্ধ থেকে নিষ্কৃতি চায়। তবে ইরানের মজুত ইউরেনিয়াম অন্য দেশে স্থানান্তর করার মার্কিন দাবিতে এখনো বড় ধরনের জট রয়ে গেছে। ডোনাল্ড ট্রাম্প দাবি করেছেন, ইরান এসব মেনে নিয়েছে, কিন্তু তেহরান সরাসরি তা প্রত্যাখ্যান করে বলেছে, সমৃদ্ধ ইউরেনিয়াম অন্য কোথাও পাঠানো হবে না।

শেষ পর্যন্ত আসন্ন আলোচনাগুলো কি এই বরফ গলাতে পারবে? একদিকে যেমন কিছু সুযোগ সৃষ্টি হয়েছে, তেমনি প্রতিবন্ধকতাও কম নয়। বিশেষ করে ইসরায়েল যেকোনো ইতিবাচক অগ্রগতি নস্যাৎ করে দিতে ‘স্পয়লার’ বা ভন্ডুলকারীর ভূমিকা নিতে পারে কি না, সে আশঙ্কাও অমূলক নয়। এক চরম উত্তেজনাকর পরিস্থিতির মধ্য দিয়ে যাচ্ছে বিশ্বরাজনীতি, যার গতিপ্রকৃতি এই কয়েক ঘণ্টার কূটনৈতিক সিদ্ধান্তের ওপরই নির্ভর করছে।

  • মালিহা লোদি পাকিস্তানি কূটনীতিক ও রাষ্ট্রবিজ্ঞানী

    আল-জাজিরা থেকে নেওয়া, ইংরেজি থেকে সংক্ষিপ্তাকারে অনূদিত

Read full story at source