বিশ্বকাপের বাকি আর ৫০ দিন, ৪৮ দলের মহাযজ্ঞে স্বাগত
· Prothom Alo
ফুটবল বিশ্বকাপ এলেই নড়েচড়ে বসে বিশ্বের নিয়মিত-অনিয়মিত সব ফুটবল দর্শক। ফুটবলের এই মহা আয়োজন নিয়ে আলোচনা, তর্ক-বিতর্ক তো চলবেই। সেই উন্মাদনা আরেকটু উসকে দিতে কিশোর আলোর নিয়মিত আয়োজন ‘বিশ্বকাপের হাওয়া’। বিশ্বকাপের বাকি আর মাত্র ৫০ দিন। আজ থেকে প্রতিদিন বিশ্বকাপ নিয়ে লেখা থাকবে কিশোর আলোর ওয়েবসাইটে।
Visit mchezo.co.za for more information.
২০২৬ বিশ্বকাপের অফিশিয়াল পোস্টার।বিশ্বকাপ আবারও কড়া নাড়ছে দরজায়। ‘মাত্র’ সাড়ে তিন বছর বিরতি দিয়ে সবচেয়ে কম সময়ের ব্যবধানে আবারও বিশ্বকাপের আসর নিয়ে হাজির হয়েছে ফিফা। তবে এবারের বিশ্বকাপ অন্য সব বিশ্বকাপের চেয়ে আলাদা। ফরম্যাট, দল থেকে শুরু করে আয়োজক—সবকিছুতেই ভিন্নতা যোগ করেছে এবারের বিশ্বকাপ।
ইতালি কি এবার বিশ্বকাপের টিকিট পাবে?একদম শুরু থেকেই শুরু করা যাক, বিশ্বকাপের ২৩তম আসর হতে চলেছে প্রথম আসর, যেখানে আয়োজনে হাত মেলাচ্ছে তিনটি ভিন্ন দেশ। যুক্তরাষ্ট্র, মেক্সিকো এবং কানাডা—একসঙ্গে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে আয়োজন করছে ‘দ্য গ্রেটেস্ট শো অন আর্থ’। এটিই হবে ইতিহাসের প্রথম বিশ্বকাপ, যেখানে তিনটি আয়োজক দেশ আয়োজন করবে একসঙ্গে। এর আগে ২০০২ সালে জাপান ও দক্ষিণ কোরিয়া মিলে আয়োজন করেছিল বিশ্বকাপ। কিন্তু এবারের গল্পটা আরেকটু আলাদা। মেক্সিকোর তপ্ত মরুভূমি থেকে কানাডার বরফে ঢাকা মেরু অঞ্চল, সব জায়গাতেই ছড়িয়ে পড়বে বিশ্বকাপ। শুধু তা–ই নয়, এই বিশ্বকাপ দিয়ে মেক্সিকো আবার গড়তে যাচ্ছে এক অনন্য রেকর্ড—প্রথম দেশ হিসেবে তিনবার (১৯৭০, ১৯৮৬ ও ২০২৬) বিশ্বকাপ আয়োজনের গৌরব অর্জন করতে যাচ্ছে তারা। যুক্তরাষ্ট্রও ১৯৯৪ সালের পর দ্বিতীয়বারের মতো আয়োজন করছে বিশ্বকাপ।
ফরম্যাটে পরিবর্তন
সবচেয়ে বড় পরিবর্তন আসছে আসরের ফরম্যাটে। ১৯৯৮ সাল থেকে চলে আসা ৩২ দলের বিশ্বকাপ ফরম্যাট বদলে যাচ্ছে এবার। এবারের বিশ্বকাপ আয়োজন করা হবে ৪৮টি দল নিয়ে। ফিফার অধীন থাকা চার ভাগের এক ভাগ দল সরাসরি অংশ নেবে বিশ্বকাপের মূল আসরে। ফলে ম্যাচের সংখ্যাও ৬৪ থেকে বেড়ে হচ্ছে ১০৪!
৪৮ দলকে ভাগ করা হয়েছে ১২টি গ্রুপে, প্রতিটি গ্রুপে থাকবে চারটি করে দল। গ্রুপ পর্বের সেরা দুটি দলের পাশাপাশি সেরা আটটি তৃতীয় স্থান অধিকারী দলও পৌঁছে যাবে নকআউট পর্বে। গ্রুপ পর্ব থেকে মোট ৩২ দল টিকিট কাটবে নকআউট রাউন্ডের। এরপর সেখান থেকে নকআউট পর্বের ম্যাচ খেলতে খেলতে ফাইনালে।
বলবয় থেকে বায়ার্নের গোলরক্ষক২০২৬ বিশ্বকাপের তিন মাসকট—ক্লাচ, মুস ও জায়ু। ছবি: এক্স
বিশ্বকাপের প্রযুক্তি
প্রযুক্তির দিক থেকেও এবারের বিশ্বকাপ ছাড়িয়ে যাচ্ছে আগের সবাইকে। ২০২২ কাতার বিশ্বকাপের ‘সেমি-অটোমেটেড অফসাইড’ প্রযুক্তি হয়েছে আরও উন্নত। এ ছাড়া আগে থেকে থাকা গোললাইন প্রযুক্তি থেকে শুরু করে বলের ভেতর সেন্সর, সবকিছুই থাকছে এবারের বিশ্বকাপে। বিশাল বড় এলাকাজুড়ে এই সুবিশাল আয়োজন সামলানোর দায়িত্ব আগে থেকেই করে রেখেছে ফিফা। দলগুলোকে যেন যাতায়াতের ঝক্কি না পোহাতে হয় তাই পুরো আসরকে তিনটি জোনে (পশ্চিম, মধ্য ও পূর্ব) ভাগ করেছে ফিফা। অর্থাৎ কোনো দলকে যেন ম্যাচ খেলতে লস অ্যাঞ্জেলেস থেকে নিউইয়র্কে বারবার উড়াল দিতে না হয়, সেদিকেও খেয়াল রেখেছে তারা। কানাডার টরন্টো থেকে মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়াম—ফুটবল যেন পুরো উত্তর আমেরিকাকে এক সুতায় বেঁধে ফেলবে। মেক্সিকোর আজটেকা স্টেডিয়াম থেকেই শুরু হবে বিশ্বকাপের আয়োজন, আজ থেকে ঠিক ৫০ দিন পর।
বিশ্বকাপের মাসকট
এবারের বিশ্বকাপে তিন দেশকে কেন্দ্র করে আছে তিন মাসকট। ক্লাচ হলো একটি আমেরিকান বল্ড ইগল, যা যুক্তরাষ্ট্রের প্রতিনিধিত্ব করছে। ম্যাপল হলো কানাডার জাতীয় প্রাণী মুস। যার নামকরণ করা হয়েছে কানাডার জাতীয় প্রতীক ম্যাপলপাতা থেকে। আর জায়ু হলো মেক্সিকোর দক্ষিণাঞ্চলের জঙ্গল থেকে আসা একটি জাগুয়ার।
২০২৬ বিশ্বকাপের বলের নাম ‘ত্রিয়োন্দা’। বরাবরের মতোই বিশ্বকাপের বল তৈরি করেছে অ্যাডিডাস। আর অনুপ্রেরণা হিসেবে বেছে নিয়েছে তিন স্বাগতিক দেশকে। স্প্যানিশ শব্দ ‘ত্রিয়োন্দা’ মূলত দুটি শব্দের মিশেল। ‘ত্রিও’ অর্থ তিন, আর ‘ওন্দা’ অর্থ ঢেউ। দুইয়ে মিলে হয় তিনটি ঢেউ। এই বলে দেখা যাবে ঢেউয়ের মতো ডিজাইন করা তিন দেশকে। লাল, নীল আর সবুজ—তিন রং দিয়ে বোঝানো হয়েছে তিন দেশকে। লাল দিয়ে কানাডা, নীল দিয়ে যুক্তরাষ্ট্র আর সবুজ দিয়ে বোঝানো হয়েছে মেক্সিকোকে। এমনকি তিন দেশের প্রতীকও আছে বলের মধ্যে। কানাডার আইকনিক ম্যাপলপাতা, যুক্তরাষ্ট্রের তারকা আর মেক্সিকোর ইগল।
বিশ্বকাপ হবে আর আয়োজন নিয়ে বিতর্ক থাকবে না, তা কি হয়? ইতিমধ্যেই বিশ্বকাপের মাঠে ঘাসের মান নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেকে। যুক্তরাষ্ট্রের মাঠের কৃত্রিম ঘাসের বদলে প্রাকৃতিক ঘাস লাগানো হলেও সেটা খেলোয়াড়দের কতটুকু উপকারে আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনাল থেকে ফাইনাল পর্যন্ত সবগুলো ম্যাচ যুক্তরাষ্ট্রে হওয়া নিয়েও কথা তুলেছেন স্বাগতিকরা। বাকি দুই দেশের থেকে বেশি প্রাধান্য পাচ্ছে যুক্তরাষ্ট্র। এরপর আরও শোনা যাচ্ছে বিশ্বকাপ ফাইনালে আয়োজন করা হবে হাফ টাইম শো। অর্থাৎ বিশ্বকাপ ফাইনালে ৪০ মিনিট ধরে গান শুনতে হবে দর্শকদের। হাফ টাইমে এমন শো খেলার ছন্দে ব্যাঘাত ঘটাবে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন অনেক ফুটবলপ্রেমী।
যেভাবে বিশ্বকাপের স্বপ্ন দেখছে আয়ারল্যান্ডবিশ্বকাপের বল ‘ত্রিয়োন্দা’। ছবি: এক্স
এ তো গেল মাঠের ভেতরের ঘটনা। এ ছাড়া মাঠের বাইরে বিশ্বের পরিস্থিতি তো তোমাদের জানাই আছে। বিশ্বকাপের আগে আগে ইরান যুদ্ধ আর তেল–সংকট নিয়ে আলাদা মাথাব্যথা সবার। চলমান পরিস্থিতি থাকলে ইরান খেলতে আসবে কি না, সেটাও একটা প্রশ্ন। সেই সঙ্গে খেলোয়াড় ও ভক্তদের ভিসা দেওয়া নিয়েও গড়িমসির শেষ নেই যুক্তরাষ্ট্রে। সব মিলিয়ে বিশ্বকাপের আয়োজন নিয়ে শঙ্কার শেষ নেই।
কিন্তু বরাবরের মতো বল মাঠে গড়ালেই সব শঙ্কা উবে যায় মুহূর্তেই। শুরুর পর মানুষের আগ্রহের কেন্দ্রবিন্দু হয়ে ওঠে ফুটবল। মেসি-রোনালদো থেকে শুরু করে বহু মহারথীর শেষ বিশ্বকাপের আয়োজন শুরু হতে বাকি মাত্র ৫০ দিন। এই বিশ্বকাপের হাওয়ায় উড়ে যেতে প্রস্তুত তো?
বিশ্বকাপের বলই বলবে অফসাইডের সিদ্ধান্ত