‘অপপ্রচারকারী’ফেসবুক পেজের অ্যাডমিনদের চালান সাদিক কায়েম, অভিযোগ ছাত্রদলের আবিদুলের

· Prothom Alo

বিতর্কিত যেসব ফেসবুক পেজ থেকে ভুয়া ফটোকার্ড প্রচারসহ বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হয়, সেসব পেজের অ্যাডমিনদের (পরিচালনাকারী) সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে নির্দেশনা দেওয়া এবং অর্থায়নের অভিযোগ উঠেছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় কেন্দ্রীয় ছাত্র সংসদের (ডাকসু) সহসভাপতি (ভিপি) মো. আবু সাদিকের (সাদিক কায়েম) বিরুদ্ধে। এ অভিযোগ তুলেছেন জাতীয়তাবাদী ছাত্রদলের প্যানেল থেকে ডাকসুর ভিপি পদে নির্বাচন করে পরাজিত আবিদুল ইসলাম খান।

গতকাল শনিবার রাতে একটি বেসরকারি টেলিভিশন চ্যানেলের টক শোতে আলোচক ছিলেন ইসলামী ছাত্রশিবিরের কেন্দ্রীয় আন্তর্জাতিক বিষয়ক সম্পাদক সাদিক কায়েম এবং ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় শাখা ছাত্রদলের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আবিদুল ইসলাম খান। সেখানে সাদিকের সামনেই তাঁর বিরুদ্ধে এ অভিযোগ তুলে জবাব চান আবিদুল। পরে ফেসবুকে নিজের ভেরিফায়েড অ্যাকাউন্টে এক পোস্টে কিছু ‘তথ্যপ্রমাণসহ’ সেই অভিযোগটি তুলে ধরেন আবিদুল।

Visit forestarrow.rest for more information.

ফেসবুক পোস্টে ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলাম অভিযোগ করেন, ডিইউ ইনসাইডার, ঢাবি কণ্ঠস্বর (বর্তমান নাম: ডেইলি ডাকসু), ডিইউ অবজার্ভার (বর্তমান নাম: ভয়েস অব জেন জেড)—এই পেজগুলো থেকে বিভিন্ন অপপ্রচার চালানো হয়ে থাকে। এই ‘প্রোপাগান্ডা পেজগুলোর’ অ্যাডমিন (পরিচালনাকারী) ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ফারসি ভাষা ও সাহিত্য বিভাগের ২০১৮-১৯ শিক্ষাবর্ষের ছাত্র ফয়সাল উদ্দিন, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগের ২০১৯-২০ শিক্ষাবর্ষের হাসানুল বান্নাহ ও আহমেদ জুবায়ের নামের একজন (পরিচয় অজানা)। তাঁদের মধ্যে হাসানুল বান্নাহ বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজয় একাত্তর হল ছাত্র সংসদের ভিপি।

সাদিক কায়েমকে এই তিনজনের ‘ফান্ডদাতা ও মদদদাতা’ হিসেবে তুলে ধরেছেন আবিদুল ইসলাম। তিনি অভিযোগ করেন, ফয়সাল উদ্দিন, হাসানুল বান্নাহ ও আহমেদ জুবায়ের—এই তিনজন সরাসরি সাদিক কায়েমের সঙ্গে সম্পর্কিত। সাদিক কায়েম সরাসরি হোয়াটসঅ্যাপে এঁদের নির্দেশ দেন এবং ফান্ড (তহবিল বা টাকা) দেন।

সাদিক কায়েমের সঙ্গে ওই তিনজনের কথোপকথনের কিছু ‘তথ্যপ্রমাণ’ পোস্টের মন্তব্যের ঘরে যুক্ত করেছেন আবিদুল। ফয়সাল ও হাসানুলের সঙ্গে সাদিক কায়েমের ছবিও পোস্টে যুক্ত করেন তিনি।

চ্যানেল টোয়েন্টিফোরের টক শোতে আবিদুল ইসলাম খান ও সাদিক কায়েম।

ফেসবুক পোস্টের সঙ্গে ফয়সাল উদ্দিনের ফেসবুক অ্যাকাউন্টের একটি স্ক্রিন রেকর্ড প্রকাশ করেছেন আবিদুল ইসলাম। সেখানে দেখা যাচ্ছে, ফয়সালের ব্যক্তিগত অ্যাকাউন্ট থেকে বিভিন্ন নামের সাতটি ফেসবুক পেজ চলমান রয়েছে। ওই সাতটি পেজের মধ্যে ডিইউ ইনসাইডার ও ডিইউ অবজার্ভারও রয়েছে।

ফেসবুকে প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান ও তাঁর মেয়ে জাইমা রহমানকে নিয়ে অশালীন পোস্ট দেওয়ার জন্য সম্প্রতি ছাত্রশিবিরের বিরুদ্ধে অভিযোগ তোলে ছাত্রদল। তা নিয়ে গত বৃহস্পতিবার শাহবাগ থানার সামনে হামলা ও মারধরের শিকার হন ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিক আলী ইবনে মোহাম্মদ। এর এক দিন পরেই ডাকসু সভাপতির বিরুদ্ধে অভিযোগ তুললেন আবিদুল ইসলাম।

‘ভিত্তিহীন’ বলছেন সাদিক কায়েম

ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলামের অভিযোগ, ভুয়া পেজগুলো কার্যত ছাত্রশিবির পরিচালনা করে। এগুলো থেকে ভিন্নমতের ছাত্রনেতা ও রাজনীতিকদের নিয়ে নিয়মিত গুজব–অপপ্রচার করা হয়। শিবিরের মতাদর্শের সঙ্গে কারও কথা বা যুক্তি না মিললেই পেজটি থেকে গুজব ছড়ানো হয়। কিন্তু শিবির বা জামায়াতে ইসলামীর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ উঠলে, তা নিয়ে সেখানে কোনো ফটোকার্ড বা লেখালেখি দেখা যায় না।

আবিদুল তাঁর ফেসবুক পোস্টে লিখেছেন, ‘(গতকাল রাতে) টক শোতে প্রমাণ উপস্থাপনের পর একবারও এটি নিয়ে কথা বলেননি সাদিক কায়েম। অভিযুক্ত ফয়সাল উদ্দিন, হাসানুল বান্না ও জুবায়েরের সঙ্গে তাঁর সম্পর্কের ব্যাপারে কোনো রকম খোলাসা করেননি। এ ব্যাপারে তিনি নিশ্চুপ ছিলেন। আমি তাঁকে আহ্বান করব, জাতির কাছে সত্য স্বীকার করুন, ক্ষমা চান; আর অস্থিতিশীলতা সৃষ্টি করবেন না।’

ফয়সাল উদ্দিন এসব ফেসবুক পেজের অ্যাডমিন বলে দাবি করা হচ্ছেশাহবাগে ডাকসু নেতা এ বি জুবায়ের ও মুসাদ্দিকের ওপর হামলা

জানতে চাইলে আবিদুলের তোলা এসব অভিযোগ ‘মিথ্যা ও ভিত্তিহীন’ বলে দাবি করেন সাদিক কায়েম। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, কে কার সঙ্গে ছবি তুলেছেন, এর জন্য তাঁর ওপর কোনো বিষয়ের দায় চাপিয়ে দেওয়ার বিষয়টি সম্পূর্ণ অপ্রাসঙ্গিক।

যাঁদের বিরুদ্ধে আবিদুল অভিযোগ করেছেন, তাঁদের কর্মকাণ্ড বিতর্কিত হলে ছাত্রদলকে আইন অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এদিকে সাদিক কায়েমের সঙ্গে ফয়সাল উদ্দিনের সরাসরি যোগাযোগ প্রমাণে সাম্প্রতিক একটি কথোপকথনের স্ক্রিনশট ফেসবুক পোস্টে মন্তব্যের ঘরে যুক্ত করেছেন আবিদুল। সেই কথোপকথনের সময় পবিত্র হজ পালনে সৌদি আরবের মক্কা শরিফে ছিলেন সাদিক। তিনি ফয়সালকে লেখেন, ‘আসসালামু আলাইকুম ওয়া রাহমাতুল্লাহ। বায়তুল্লাতে ইতিকাফে আছি। তোমার নাম ধরে দোয়া করেছি। আল্লাহ তোমাকে আরও সম্মানিত করুক এবং নিরাপত্তার চাদরে আবৃত করে রাখুক। আমিন।’

চট্টগ্রামে ‘গুপ্ত’ লেখা নিয়ে ছাত্রদল-শিবির সংঘর্ষ

এই কথোপকথনের বিষয়ে সাদিক কায়েমের ভাষ্য, তিনি সবার জন্যই দোয়া চেয়েছেন। ফয়সালকে তিনি যে বার্তা পাঠিয়েছিলেন, একই বার্তা অভিযোগকারী ছাত্রদল নেতা আবিদুল ইসলাম খানসহ আরও অনেককেই দিয়েছিলেন। এর সঙ্গে কাউকে ‘ফান্ডিং বা স্পনসর’ করার কোনো সম্পৃক্ততা নেই। এ অভিযোগ সম্পূর্ণ অযৌক্তিক।

এ বিষয়ে ছাত্রদল নেতা আবিদুল প্রথম আলোকে বলেন, সাদিক তাঁকেসহ ছাত্রদলের আরও অনেকেই বার্তা পাঠিয়েছিলেন ঠিকই, তবে তাতে অপপ্রচারের সঙ্গে যুক্ত থাকার অভিযোগ মিথ্যা প্রমাণিত হয় না।

‘নোংরা সংস্কৃতি শুরু করেছিল শিবির’

গত বছরের ৯ সেপ্টেম্বর ডাকসু ও ১৮টি হল সংসদের নির্বাচনে অধিকাংশ পদে জয় পায় জামায়াতের ছাত্রসংগঠন ইসলামী ছাত্রশিবির সমর্থিত প্যানেল। এর মধ্যে ভিপি পদে ১৪ হাজার ৪২ ভোট পেয়ে জিতেছিলেন শিবিরের প্রার্থী সাদিক কায়েম। তাঁর নিকটতম প্রতিদ্বন্দ্বী ছাত্রদলের প্রার্থী আবিদুল ইসলাম পেয়েছিলেন ৫ হাজার ৭০৮ ভোট।

সেই নির্বাচনে বৈষম্যবিরোধী শিক্ষার্থী সংসদের ভিপি প্রার্থী ছিলেন আবদুল কাদের। জুলাই গণ–অভ্যুত্থানের সময় ৯ দফা ঘোষণা করে আলোচনায় আসা কাদের সাম্প্রতিক বিভিন্ন বিষয়ে প্রায় নিয়মিতই ফেসবুকে লেখালেখি করেন। গতকাল রাতে আবিদুল ফেসবুক পোস্টে শিবিরের নেতা সাদিক কায়েমের বিরুদ্ধে যে অভিযোগ তুলেছেন, তা সমর্থন করে আজ সকালে ফেসবুকে একটি পোস্ট দেন কাদের।

আবদুল কাদের লিখেছেন, ‘শিবির পরিকল্পিতভাবে এই ফয়সালদের দিয়ে রাজনীতিতে নোংরা সংস্কৃতি চালু করেছিল। অনলাইনে সংঘবদ্ধ ফোর্স আকারে এদের মাঠে নামিয়ে দিয়েছিল...সরাসরি সাদিক কায়েমের যোগসাজশে এই ফয়সাল এসব কাজ করেছে পূর্ণোদ্যমে।’

ফয়সাল ও তাঁর ‘পৃষ্ঠপোষকদের’ আইনের আওতায় আনার দাবি তোলেন কাদের।

ফয়সাল উদ্দিনের সঙ্গে সাদিক কায়েমের কথোপকথনের স্ক্রিনশট

সাদিক কায়েমের কাছ থেকে টাকা পাওয়ার অভিযোগ ভিত্তিহীন বলছেন ফয়সাল উদ্দিন। হোয়াটসঅ্যাপে সাদিক কায়েম তাঁকে নির্দেশনা দেন, এ অভিযোগও সঠিক নয় দাবি করেন তিনি। ফয়সাল উদ্দিন প্রথম আলোকে বলেন, হল ও বিভাগের সিনিয়র হওয়ায় বিভিন্ন প্রয়োজনে সাদিকের সঙ্গে তাঁর কথা হয়। ২০২৩ সাল পর্যন্ত তিনি হলে ছিলেন, পরে হল থেকে বিদায় নেন।

ডাকসুর ভিপি পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করা শামীম হোসেনও বলছেন, ডাকসু নির্বাচনের সময় প্রথমে তাঁকে ইসলামবিরোধী প্রমাণের চেষ্টা করা হয়। পরে চেষ্টা করা হয় আওয়ামী লীগ বানানোর। তখন তিনি কিছু পেজের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ডাকসুর নির্বাচন কমিশনের কাছে অভিযোগ করেছিলেন।

আজ বিকেলে শামীম ফেসবুকে লিখেছেন, ‘আজকে পেজের অ্যাডমিনকে পাওয়া গেছে। সেখানে শিবিরের বিজয় একাত্তর হল সংসদের নেতা (হাসানুল বান্নাহ) অ‍্যাডমিন। ৫ আগস্টের পর যারা মিথ‍্যা তথ‍্য ছড়িয়ে অপর সব নেতাকে রাজনীতি থেকে মাইনাস করার চেষ্টা করেছেন, তাদের মুখোশ আস্তে আস্তে উন্মোচিত হচ্ছে।’

এ বিষয়ে জানতে অভিযুক্ত হাসানুল বান্নাহর মুঠোফোনে কল করলেও তিনি ধরেননি, হোয়াটসঅ্যাপে খুদে বার্তা পাঠালেও সাড়া দেননি তিনি।

Read full story at source