মোবাইল ফোন কি বজ্রপাত আকর্ষণ করে? কী সাবধানতা অবলম্বন করতে হবে এ ব্যাপারে
· Prothom Alo

বজ্রসহ ঝড়বৃষ্টির এই মৌসুমে একটি প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই উঁকি দেয়। আর তা হলো, মোবাইল ফোন কি বজ্রপাত আকর্ষণ করে?
Visit biznow.biz for more information.
কালবৈশাখীর দিন এখন। এই ঝড়বৃষ্টি চলবে বর্ষাকালের শেষ পর্যন্ত। এর মাঝে জানা যাচ্ছে গতকাল ঝড়ের সময় বজ্রপাতে দেশে ১৪ জন মারা গিয়েছেন। বজ্রসহ ঝড়বৃষ্টির এই মৌসুমে একটি প্রশ্ন সাধারণ মানুষের মনে প্রায়ই উঁকি দেয়। আর তা হলো, মোবাইল ফোন কি বজ্রপাত আকর্ষণ করে? বিশেষ করে যখন বজ্রপাত বেড়ে যায়, তখন অনেককেই দেখা যায় ভয়ে ফোন বন্ধ করে রাখতে। কিন্তু বৈজ্ঞানিক তথ্য ও বিশেষজ্ঞদের অভিমত কী বলে? চলুন জেনে নেওয়া যাক আধুনিক এই ডিভাইসটি নিয়ে প্রচলিত ধারণা ও বজ্রপাতের প্রকৃত ঝুঁকি সম্পর্কে।
বজ্রপাত বেড়ে যায়, তখন অনেককেই দেখা যায় ভয়ে ফোন বন্ধ করে রাখতেমোবাইল ও বজ্রপাত: ভ্রান্ত ধারণা বনাম বাস্তবতা
অনেকের ধারণা, মোবাইলের রেডিও তরঙ্গ বা ইলেকট্রোম্যাগনেটিক সিগন্যাল বজ্রপাতকে নিজের দিকে টেনে আনে। তবে আবহাওয়াবিদ এবং বিজ্ঞানীদের মতে, এটি সম্পূর্ণ একটি ভুল ধারণা। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন (NOAA) স্পষ্ট করেছে যে, মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত তরঙ্গ বা এর ভেতরে থাকা অতি সামান্য পরিমাণ ধাতু বজ্রপাতকে আকর্ষণ করার মতো কোনো শক্তি রাখে না।
মোবাইল ফোনে ব্যবহৃত তরঙ্গ বা এর ভেতরে থাকা অতি সামান্য পরিমাণ ধাতু বজ্রপাতকে আকর্ষণ করার মতো কোনো শক্তি রাখে নাবজ্রপাত সাধারণত কোনো নির্দিষ্ট সিগন্যালের ওপর ভিত্তি করে পড়ে না; বরং এটি আকাশ থেকে মাটিতে নামার জন্য সবচেয়ে সহজ ও দ্রুততম পথ খুঁজে নেয়। এই পথটি সাধারণত উঁচু ভবন, বড় গাছ বা খোলা মাঠে থাকা কোনো উঁচু বস্তু হয়ে থাকে। মোবাইল ফোন কোনোভাবেই এই প্রক্রিয়ায় প্রভাব ফেলে না।
কেন এই আতঙ্ক?
এই মিথটি মূলত ল্যান্ডফোনের যুগ থেকে এসেছে। পুরোনো আমলের তারযুক্ত ল্যান্ডফোন বজ্রপাতের সময় ব্যবহার করা ঝুঁকিপূর্ণ ছিল। কারণ বজ্রপাত যখন ল্যান্ডফোনের খুঁটিতে বা তারে পড়ত, তখন সেই বিদ্যুৎ সরাসরি তারের মাধ্যমে ব্যবহারকারীর কানে পৌঁছাত। কিন্তু আধুনিক মোবাইল ফোন সম্পূর্ণ তারবিহীন। এটি কোনো বাহ্যিক বৈদ্যুতিক লাইনের সঙ্গে যুক্ত থাকে না, তাই এটি দিয়ে বজ্রবিদ্যুৎ প্রবাহিত হওয়ার সুযোগ নেই।
বিশেষ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি থাকে—যদি আপনি বজ্রপাতের সময় ফোনটি চার্জে দিয়ে ব্যবহার করেনতবে একটি বিশেষ পরিস্থিতিতে ঝুঁকি থাকে—যদি আপনি বজ্রপাতের সময় ফোনটি চার্জে দিয়ে ব্যবহার করেন। সেক্ষেত্রে বাড়ির বিদ্যুতের লাইনে বজ্রপাত আঘাত করলে তা চার্জারের মাধ্যমে আপনার ফোনে বা শরীরে পৌঁছাতে পারে।
বজ্রপাত কেন হয় এবং প্রকৃত ঝুঁকি কোথায়?
বজ্রপাত প্রধানত তিনটি বিষয়ের ওপর নির্ভর করে: উচ্চতা, বিচ্ছিন্নতা এবং সুচালো আকৃতি। আপনি যদি খোলা মাঠে বা সমুদ্রের পাড়ে দাঁড়িয়ে একা থাকেন, তবে আপনার হাতে ফোন থাকুক বা না থাকুক, আপনি উচ্চ ঝুঁকিতে আছেন। কারণ তখন আপনিই সেই এলাকার সবচেয়ে উঁচু বস্তু। মোবাইল ব্যবহারের সাথে এর কোনো সম্পর্ক নেই।
অনেকে মনে করেন পকেটে মোবাইল থাকলে বজ্রপাত সরাসরি সেখানে আঘাত করবেঅনেকে মনে করেন পকেটে মোবাইল থাকলে বজ্রপাত সরাসরি সেখানে আঘাত করবে। কিন্তু গবেষণায় দেখা গেছে, মোবাইল ব্যবহারের সময় কেউ বজ্রাঘাতের শিকার হলে সেটি কেবল কাকতালীয় ঘটনা। ওই ব্যক্তি খোলা জায়গায় বা উঁচু স্থানে থাকার কারণেই দুর্ঘটনার শিকার হয়েছেন, ফোনের কারণে নয়।
বজ্রপাতের সময় করণীয় ও সতর্কতা
যদিও ফোন বজ্রপাত আকর্ষণ করে না, তবুও ঝড়ের সময় সতর্ক থাকা জরুরি। বিশেষজ্ঞদের মতে:
১. উন্মুক্ত স্থান এড়িয়ে চলুন: মেঘের ডাক শুনলে দ্রুত কোনো পাকা দালানের নিচে আশ্রয় নিন। খোলা বারান্দা বা টিনের চালের নিচে থাকা নিরাপদ নয়।
২. উঁচু স্থান থেকে দূরে থাকুন: বড় গাছ, বৈদ্যুতিক খুঁটি বা টাওয়ারের পাশে দাঁড়াবেন না।
৩. চার্জার খুলে রাখুন: বজ্রপাতের সময় মোবাইল ফোন, ল্যাপটপ বা যেকোনো ইলেকট্রনিক ডিভাইস চার্জ দেওয়া থেকে বিরত থাকুন।
যদিও ফোন বজ্রপাত আকর্ষণ করে না, তবুও ঝড়ের সময় সতর্ক থাকা জরুরি৪. পানির সংযোগ থেকে দূরে থাকুন: স্নান করা বা হাত-মুখ ধোয়া এড়িয়ে চলুন, কারণ পাইপের মাধ্যমে বিদ্যুৎ প্রবাহিত হতে পারে।
পরিশেষে বলা যায়, মোবাইল ফোন বজ্রপাতকে চুম্বকের মতো টেনে আনে না। এটি আধুনিক বিজ্ঞানের একটি আশীর্বাদ যা দুর্যোগের সময় আমাদের যোগাযোগ বিচ্ছিন্ন হতে দেয় না। তবে ডিভাইস ব্যবহারের চেয়েও গুরুত্বপূর্ণ হলো আপনার অবস্থানের নিরাপত্তা। প্রাকৃতিক দুর্যোগের সময় আতঙ্কিত না হয়ে বৈজ্ঞানিক সতর্কতা অবলম্বন করাই বুদ্ধিমানের কাজ।
সূত্র: ন্যাশনাল ওশেনিক অ্যান্ড অ্যাটমোস্ফিয়ারিক অ্যাডমিনিস্ট্রেশন, এএমটিএ
ছবি: এআই, ইন্সটাগ্রাম ও পেকজেলস