বৃষ্টি ও পাহাড়ি ঢলে হাওরের ৪২ হাজার হেক্টর ধানের ক্ষতি
· Prothom Alo

‘জমির ধান গেল পানিতে, এখন খলার (কাটার পর স্তূপ করে রাখা) ধান নষ্ট অইযায় রইদের ( রোদ) অভাবে।’
Visit extonnews.click for more information.
কথাগুলো পঞ্চাশোর্ধ্ব কৃষক মকব্বির আলীর। তাঁর বাড়ি সুনামগঞ্জ সদর উপজেলার গোয়াছুড়া গ্রামে। বৃষ্টি ও উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢলে হাওরে থাকা খেত তলিয়ে ধানের ক্ষতি হওয়ায় এভাবে আক্ষেপ করলেন তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে টানা ভারী বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ধানখেত তলিয়ে যাওয়ায় মকব্বির আলীর মতো অনেক কৃষকের কপালে এখন চিন্তার ভাঁজ। বিশেষ করে হাওর এলাকার কৃষকেরা ধান নিয়ে পড়েছেন বড় বিপাকে।
স্থানীয় কৃষি বিভাগের দেওয়া তথ্য বলছে, বৃষ্টি আর ঢলে সুনামগঞ্জ, কিশোরগঞ্জ ও নেত্রকোনার হাওরাঞ্চলের ৪২ হাজার হেক্টরের বেশি ধানখেত তলিয়ে ফসলের ক্ষতি হয়েছে। রোদ না থাকায় ধান তোলার পরও নষ্ট হচ্ছে।
কামাল হোসেন, কৃষক পাকা ধান চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে। তাই ঘোষণা দিয়েছি যার ইচ্ছে নয়ন ভাগায় (চোখ যত দূর যায়) সে ধান যেন কেটে নিয়ে যাক।সুনামগঞ্জে ৫০০ কোটি টাকার ধান নষ্ট
সুনামগঞ্জে এবার মার্চের মাঝামাঝি থেকে বৃষ্টি শুরু হয়। এতে বিভিন্ন হাওরে জলাবদ্ধতা দেখা দেয়। এপ্রিলের শেষ দিকে এসে শুরু হয় অতিবৃষ্টি। এর সঙ্গে যুক্ত হয় উজান থেকে আসা পাহাড়ি ঢল। এতে হাওরে ফসলের ব্যাপক ক্ষতি হয়েছে। কমবেশি সব হাওরেই ধানের অনেক ক্ষতি হয়েছে। এখনো ঝুঁকিতে আছে হাওরের বাকি ধান।
জেলার কৃষি বিভাগের প্রাথমিক হিসাব বলছে, অতিবৃষ্টি ও ঢলে ১৮ হাজার হেক্টরের ধানের ক্ষতি হয়েছে। এর আগে জলাবদ্ধতায় ক্ষতি হয় ২ হাজার হেক্টর। সেই হিসাবে টাকার অঙ্কে ধানের ক্ষতি প্রায় ৫০০ কোটি টাকার।
যদিও হাওরে কৃষকদের নিয়ে কাজ করা বিভিন্ন সংগঠনের লোকজন বলছেন, কৃষি বিভাগের দেওয়া হিসাবের চেয়ে ধানের ক্ষতির পরিমাণ আরও বেশি। হাওরের নিচু অংশে এখনো যে পরিমাণ পানি রয়ে গেছে, তাতে ধান কাটার কোনো উপায় নেই। এসব জমিতে থাকা ধানের যে হিসাব কৃষি বিভাগ দিচ্ছে, সবই ক্ষতির সঙ্গে যুক্ত হবে।
সুনামগঞ্জ হাওর ও নদী রক্ষা আন্দোলনের সভাপতি মোহাম্মদ রাজু আহমেদ বলেন, ‘কৃষি বিভাগ যে হিসাব দেখিয়েছে, তাতে হাওরে ৪৭ হাজার হেক্টর জমির ধান এখনো কাটা হয়নি। এই জমি তো সব পানির নিচে। এখন আর গভীর হাওরে কোনো ধান কাটার মতো অবস্থা নেই। আমরা মনে করছি, কমপক্ষে ৫০ হাজার হেক্টর জমির ধান ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। এই ক্ষতির পরিমাণ আরও বাড়বে।’
হাওরে গত দুই দিন বৃষ্টি না হওয়ায় কিছুটা স্বস্তি দেখা দিয়েছিল। কিন্তু সেই স্বস্তির ভাব কাটতে সময় লাগেনি। গতকাল শনিবার ভোর থেকে সুনামগঞ্জে আবার থেমে থেমে বৃষ্টি হচ্ছে। রোদ না থাকায় কাটা ধান মাড়াই করতে ভোগান্তির পাশাপাশি ধান শুকানো যাচ্ছে না। খলা কিংবা বাড়িতে স্তূপ করে রাখা ধান নষ্ট হয়ে যাচ্ছে।
এখনো অনেক ধান কাটা বাকি
কৃষি বিভাগ বলছে, এবার জেলার ১৩৭টি হাওরে বোরো চাষ হয়েছে ২ লাখ ২৩ হাজার ৫১১ হেক্টর জমিতে। এর মধ্যে হাওরে ১ লাখ ৬৫ হাজার ২৭৫ হেক্টর। উঁচু অংশে ৫৮ হাজার ২৩৬ হেক্টর। শুক্রবার পর্যন্ত হাওরে ১ লাখ ১৭ হাজার ৯২০ হেক্টর আর অন্যত্র ১৪ হাজার ৪৮৯ হেক্টর কাটা হয়েছে। গড়ে হাওরে ধান কাটা হয়েছে ৫৯ শতাংশ।
হাওরের নিচু অংশের ধান আর কাটা যাবে না—এই কথার সঙ্গে অবশ্য একমত নন কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা। তাঁরা বলছেন, যদি আর ভারী বৃষ্টি না হয় এবং হাওরের পানি আর না বাড়ে, তাহলে কিছু কিছু ধান হাওরের নিচু অংশেও কাটা যাবে। এখন কৃষকেরা শুধু উঁচু অংশে চাষ করা ধান কাটছেন বলেও জানান তাঁরা।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের উপপরিচালক মোহাম্মদ ওমর ফারুক গতকাল প্রথম আলোকে বলেন, প্রাথমিক হিসাবের চেয়ে ক্ষতির পরিমাণ বাড়বে। তাঁরা মাঠপর্যায়ে ক্ষয়ক্ষতি নির্ধারণে নির্দেশনা দিয়েছেন।
হাওরের সর্বশেষ অবস্থা সম্পর্কে এই কর্মকর্তা আরও বলেন, মাঝখানে চার দিন দুর্যোগপূর্ণ আবহাওয়া ছিল। কৃষকেরা মাঠে কাজ করতে পারেননি। পরে দুই দিন (বৃহস্পতি ও শুক্রবার) রোদ ছিল। এখন আবার বৃষ্টি। আসলে এখন সবকিছুই নির্ভর করছে প্রকৃতির ওপর। প্রকৃতি সদয় হলে কৃষকেরা বাকি ধান গোলায় তুলতে পারবেন।
রোদের অভাবে নষ্ট হচ্ছে কাটা ধান
গতকাল দেখার হাওরের বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, গ্রামের পাশের খোলা মাঠে, সড়কের ওপর, খলায়, গ্রামের স্কুল ও বাড়িঘরের আঙিনায় কাটা ধান রাখা। কোথাও স্তূপ করে, কোথাও বস্তায় ভরে ধান রাখা হয়েছে।
স্তূপ থেকে ধান বের করে বাতাসে চিটা ছাড়ানোর চেষ্টা করছিলেন ইসলামপুর গ্রামের নুরজাহান বেগম (৫০)। আক্ষেপ করে এই কিষানি বলছিলেন, ‘ইতা ধান বেশি কামও লাগত নারে বাবা। অর্ধেক নষ্ট অইগিছে। কিতা করমু, যা পাই খাইবার লাগি তুলরাম।’
গোয়াছুড়া গ্রামের কৃষক চাঁন মিয়া স্তূপ থেকে ধান বের করে দেখাচ্ছিলেন ভেজা ধানে চারা গজিয়েছে। বলেন, ‘পানিতে জমির ধান যে গেছে ইটা তো সহ্য করা যায়, কিন্তু কাটার পর খলাত যে নষ্ট অইলে ইটাই বড় কষ্ট।’
‘পাকা ধান চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে’
কৃষক জহিরুল ইসলাম এক সপ্তাহ আগে ৩৫০ মণ ধান মাড়াই শেষে রোদে শুকানোর জন্য পাড়ের খলায় স্তূপ করে রেখেছিলেন। গত সাত দিন টানা বৃষ্টির কারণে সেই ধানে চারা গজিয়ে গেছে। ধান পচে ছড়াচ্ছে দুর্গন্ধ। উপায়ন্তর না দেখে তা হাওরে ভাসিয়ে দিয়েছেন।
জহিরুল ইসলামের বাড়ি কিশোরগঞ্জের করিমগঞ্জে। তাঁর মতো মানিকপুর হাওরের আরেক কৃষক তমিজ উদ্দিন একই দুঃখের কথা শোনালেন। বলেন, মাড়াই শেষে ৭০ বস্তা ধান খলায় রেখেছিলেন। শুকাতে না পেরে সে ধান পচে গেছে। বস্তাসহ তিনিও সেসব ধান হাওরের পানিতে ভাসিয়ে দিয়েছেন।
জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, কিশোরগঞ্জে টানা বৃষ্টি ও উজানের ঢলে ৯ হাজার ৪৫ হেক্টর ধানখেত তলিয়েছে। এতে ৩০ হাজারের বেশি কৃষক বিপাকে পড়েছেন। টানা এক সপ্তাহ বৃষ্টির কারণে কাটা ধান পচে যাচ্ছে। যে কারণে অনেক কৃষক এখন সেসব চারা গজানো ধান হাওরের পানিতে ফেলে দিচ্ছেন।
মিঠামইনের ঢাকি এলাকার কৃষক কামাল হোসেন বলেন, ‘পাকা ধান চোখের সামনে ডুবে যাচ্ছে। তাই ঘোষণা দিয়েছি যার ইচ্ছে নয়ন ভাগায় (চোখ যত দূর যায়) সে ধান যেন কেটে নিয়ে যাক।’
‘কোনো পথ পাইতাছি না’
‘সুদে টেহা আইন্যা কলাভাঙ্গা বিলে ১০ কাঠা জমিতে ধান লাগাইছিলাম। এক মুইঠ ধানও ঘরো তুলতে পারছি না। দিনে রাইতে বৃষ্টির পানি বাইরা চোক্ষের সামনে ধান ডুইব্বা গেছে। অহন দেনা পরিশোধ কীবায় করবাম আর পরিবার লইয়া কীবায় চলবাম? কোনো পথ পাইতাছি না।’
কথাগুলো নেত্রকোনার বারহাট্টা উপজেলার মনাস গ্রামের কৃষক মনজুরুল হকের। টানা বৃষ্টির পর দুই দিন কিছুটা স্বস্তি দেখা গেলেও গতকাল আবার বৃষ্টি শুরু হওয়ায় ফসল তোলা নিয়ে অনিশ্চয়তায় হাওরের হাজারো কৃষক।
জেলার খালিয়াজুরি, মোহনগঞ্জ, মদন, কলমাকান্দা, বারহাট্টা, আটপাড়া, কেন্দুয়াসহ বিস্তীর্ণ হাওর এলাকায় পাকা ধান তলিয়েছে। কোথাও ধান কাটার কাজ চললেও বৃষ্টিতে পানি আরও বাড়ায় সেই কাজ থমকে গেছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্য বলছে, জেলায় ১ লাখ ৮৬ হাজার হেক্টর জমিতে ধান চাষ হয়েছে। এর মধ্যে হাওরে ৪২ হাজার হেক্টর। সরকারি হিসাবে এই পর্যন্ত ১৩ হাজার ৪৬৬ হেক্টর জমির ধান পানিতে তলিয়ে গেছে। তবে স্থানীয়দের দাবি, প্রকৃত ক্ষতির পরিমাণ এর দ্বিগুণ।
মদন উপজেলার বাগজান গ্রামের কৃষক ফয়েজ আহমেদ বলেন, ‘পানি কমার কোনো লক্ষণ নাই। যে খেতে ধানের আগা একটু ভাইসা আছে, তা কাডনের লাইগ্গা দেড় হাজার টেহা দিয়াও শ্রমিক পাওয়া যাইতাছে না। অত টেহা দিয়া কাটাইলেও লাভ হতো না। কাটলেও লস, না কাটলেও লস। চোক্ষের সামনে এই ক্ষতি সহ্য হয় না।’