টিসিবির লাইনে পাঁচ ঘণ্টা অপেক্ষা সত্তোর্ধ্ব রাবেয়ার, কোলে শিশু নিয়ে দাঁড়িয়ে শম্পা

· Prothom Alo

সকাল তখন সাড়ে নয়টা। ঢাকার রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে ধীরে ধীরে দীর্ঘ হচ্ছিল টিসিবির পণ্য কিনতে ক্রেতাদের লাইন। হাতে ব্যাগ নিয়ে অন্যদের সঙ্গে সেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সত্তোর্ধ্ব রাবেয়া খাতুনও। বয়সের ভারে হাঁটাচলা কষ্টকর হলেও সংসারের খরচ বাঁচাতে তাঁকে নিয়মিতই আসতে হয় এই লাইনে।

তবে আজ শনিবারের অপেক্ষাটা ছিল আরও দীর্ঘ। ট্রাক আসতে দেরি, তারপর পণ্য বিতরণ ঘিরে বিশৃঙ্খলা—সব মিলিয়ে প্রায় পাঁচ ঘণ্টা পর হাতে পান তেল, ডাল আর চিনি।

Visit esporist.org for more information.

প্রায় সোয়া দুই ঘণ্টা অপেক্ষার পর বেলা পৌনে ১১টার দিকে টিসিবির ট্রাক আসে। সোয়া ১১টার দিকে পণ্য বিতরণ শুরু হতেই নারীদের লাইনে শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। একপর্যায়ে লাইন ভেঙে যায়। যে যেভাবে পারেন, সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেন। ভিড় আর ঠেলাঠেলির মধ্যে রাবেয়া খাতুন সামনে এগোতে পারেননি।

দীর্ঘ সময় দাঁড়িয়ে থাকার ক্লান্তি নিয়ে শেষ পর্যন্ত বেলা আড়াইটার দিকে পণ্য হাতে পান তিনি। তখন তাঁর মুখে কিছুটা স্বস্তির ছাপ দেখা যায়।

রাবেয়া খাতুন প্রথম আলোকে বলেন, ‘বাবা, এইহানে তো আমার আইসা লাইনে দাঁড়াইবার কথা আছিল না। আমার স্বামী কামকাজ করত। আট বছর অইল মইরা গেছে। একটা পোলা আছিল, ওর লগেই থাকতাম। হেও ১০ মাস আগে মইরা গেল। আমার তিনডা মাইয়া। ওগো বিয়া অইয়া গেছে, আলাদা আলাদা থাহে। এহন আমি একলাই অইয়া গেছি।’

বেলা সোয়া ১১টার দিকে পণ্য বিতরণ শুরু হতেই নারীদের লাইনে শুরু হয় ধাক্কাধাক্কি। একপর্যায়ে লাইন ভেঙে যায়। যে যেভাবে পারেন, সামনে যাওয়ার চেষ্টা করেন। আজ শনিবার ঢাকার রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে

রাবেয়া খাতুন আরও বলেন, ‘লাইনে দাঁড়াইয়া তেল-চিনি নিলে একটু সাশ্রয় অয়। কিন্তু এইডা নিতে আইসা এতক্ষণ দাঁড়াইয়া থাকলে মাজা ব্যথা করে, অনেক কষ্ট অয়। তয় কী করুম বাবা, কিছু তো করার নাই। এইভাবেই মাল নিতে অয়।’

মেয়েরা কিছুটা সাহায্য করে জানিয়ে রাবেয়া খাতুন বলেন, তবে ঘরভাড়া, খাবার আর নিত্যপণ্যের বাড়তি খরচ সামলাতে টিসিবির পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হয় তাঁকে। মাসে দুবার তিনি টিসিবির পণ্য নেন। প্রতিবারই দীর্ঘ সময় লাইনে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

কোলে শিশু নিয়েও লাইনে

রামপুরার মোল্লাবাড়ি এলাকা থেকে দেড় মাস বয়সী সন্তানকে কোলে নিয়ে এসেছিলেন শম্পা বেগম। সকাল থেকেই লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন তিনি। কিন্তু বিশৃঙ্খলা শুরু হলে শিশুকে নিয়ে বিপাকে পড়েন। পরে সরবরাহকারীদের অনুরোধ করে দুপুর সাড়ে ১২টার দিকে পণ্য সংগ্রহ করতে পারেন তিনি।

শম্পা বেগম বলেন, তাঁর স্বামী আলম সরকার অটোরিকশাচালক। দুই সন্তান নিয়ে ভাড়া বাসায় থাকেন তাঁরা। সংসারের খরচ এত বেড়েছে, এখন টিসিবির পণ্য নিতে শিশুসন্তান কোলে নিয়েই লাইনে দাঁড়াতে হচ্ছে।

পুরুষদের লাইনে দাঁড়িয়ে ছিলেন ষাটোর্ধ্ব আশরাফ আলী, পেশায় রিকশাচালক। তিনি প্রথম আলোকে বলেন, স্ত্রীকে নিয়ে রামপুরার উলন রোড এলাকায় থাকেন। দুই ছেলে বিয়ের পর আলাদা হয়ে গেছেন। বয়সের কারণে এখন আর আগের মতো রিকশা চালাতে পারেন না। স্বল্প আয়ে সংসার চালানো কঠিন হয়ে পড়েছে। তাই কম দামে নিত্যপণ্য কিনতে টিসিবির লাইনে দাঁড়িয়েছেন।

পণ্য নিতে আসা ব্যক্তিদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, শুধু নিম্নবিত্ত নয়, মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষও এখন টিসিবির লাইনে দাঁড়াচ্ছেন। আয়ের সঙ্গে জীবনযাত্রার ব্যয়ের সামঞ্জস্য না থাকায় সংসারের খরচ কমাতে বাধ্য হয়ে ভর্তুকিমূল্যের পণ্যের ওপর নির্ভর করতে হচ্ছে অনেককে।

টিসিবির পণ্য নিতে দুই শতাধিক নারী-পুরুষ জড়ো হন। আজ শনিবার ঢাকার রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে

বিশৃঙ্খলা সামলাতে হিমশিম

আজ রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে টিসিবির পণ্য নিতে দুই শতাধিক নারী-পুরুষ জড়ো হন। ভ্রাম্যমাণ ট্রাক থেকে সুলভ মূল্যে সর্বোচ্চ দুই লিটার তেল, দুই কেজি ডাল এবং দুই কেজি চিনি একসঙ্গে কেনার সুযোগ পান তাঁরা।

নারী ও পুরুষদের জন্য আলাদা লাইন থাকলেও কিছু সময় পর নারীদের লাইনে বিশৃঙ্খলা শুরু হয়। পরিস্থিতি সামাল দিতে হিমশিম খেতে হয় সরবরাহকারীদের। একপর্যায়ে হট্টগোল শুরু হলে কিছু সময়ের জন্য নারীদের পণ্য বিতরণ বন্ধ রাখা হয়। পরে বাধ্য হয়ে বিশৃঙ্খলার মধ্যেই পণ্য বিতরণ চালিয়ে যান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

এখানে পণ্য নিতে আসা ব্যক্তিদের মধ্যে বিভিন্ন শ্রেণি-পেশার মানুষ ছিলেন। রামপুরা, বাড্ডা, গোড়ান, মেরাদিয়াসহ আশপাশের বিভিন্ন এলাকা থেকে মানুষ এসেছিলেন টিসিবির পণ্য নিতে।

রামপুরা টিভি সেন্টারের সামনে আজ পণ্য বিতরণ করে জান্নাত স্টোর নামের একটি প্রতিষ্ঠান। প্রতিষ্ঠানটির স্বত্বাধিকারী আজিজুল হাকিম বলেন, আজ আড়াই শ নারী ও দেড় শ পুরুষকে সুলভ মূল্যে পণ্য দেওয়া হয়েছে। সকালে লাইনে দাঁড়ানো সবাই শেষ পর্যন্ত পণ্য পেয়েছেন। বেলা তিনটার দিকে ট্রাকের সব পণ্য বিক্রি শেষ হয়েছে।

Read full story at source