ইতিবাচক সিদ্ধান্ত, বাস্তবায়নে দরকার তদারকি
· Prothom Alo

দেশে প্রতিবন্ধী মানুষের সংখ্যা প্রায় ৪৬ লাখ হলেও তাঁদের প্রবেশগম্যতার উপযোগী করে অবকাঠামো, পরিবহনব্যবস্থা ও নাগরিক সুবিধা নেই বললেই চলে। ফলে দেশের প্রায় ২ দশমিক ৮ শতাংশ মানুষ নাগরিক অধিকার থেকে বঞ্চিত হয়ে আসছেন। এ প্রেক্ষাপট বিবেচনায় সিটি করপোরেশন এলাকায় রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল ও ক্যাফেতে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা র্যাম্প ও শৌচাগার স্থাপন বাধ্যতামূলক করার সরকারি সিদ্ধান্তকে ইতিবাচক বলে আমরা মনে করি। তবে শুধু হোটেল–রেস্তোরাঁ নয়, নাগরিক সেবার সঙ্গে সংশ্লিষ্ট প্রতিটি প্রতিষ্ঠান, সেবা সংস্থা ও গণপরিবহনে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতার সুবিধা চালু করা জরুরি।
Visit freshyourfeel.org for more information.
প্রথম আলোর খবর জানাচ্ছে, ১৩ মে প্রধানমন্ত্রীর সভাপতিত্বে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের অধিকার সুরক্ষা ও সেবা নিশ্চিতকরণ-সংক্রান্ত সভা অনুষ্ঠিত হয়। ওই সভায় প্রধানমন্ত্রী নির্দেশ দেন, সিটি করপোরেশন এলাকায় থাকা রেস্তোরাঁ, আবাসিক হোটেল ও ক্যাফেগুলোয় প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য আলাদা র্যাম্প নির্মাণ ও শৌচাগার স্থাপন যৌক্তিক সময়ের মধ্যে নিশ্চিত করতে হবে। এরপর ১৪ মে স্থানীয় সরকার বিভাগ দেশের সব সিটি করপোরেশনকে এ বিষয়ে চিঠি দেয়।
প্রতিবন্ধীদের নাগরিক অধিকারের দাবিতে বাংলাদেশে দীর্ঘদিন ধরেই আন্দোলন চলে আসছে। তবে বাস্তবতা হলো, সামাজিক সুরক্ষা কর্মসূচির আওতায় ভাতা প্রদান ছাড়া এখন পর্যন্ত প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের নাগরিক সুবিধা নিশ্চিত করা যায়নি। অথচ একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক সমাজ গঠন করতে হলে প্রতিবন্ধীবান্ধব অবকাঠামো স্থাপন এবং তাঁদের জন্য শিক্ষা, চিকিৎসা, সরকারি সেবাসহ সব ধরনের সুযোগ-সুবিধা নিশ্চিত করা।
শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, সরকারি কার্যালয় ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, হোটেল–রেস্তোরাঁসহ জনপরিসরগুলো প্রতিবান্ধব করে গড়ে তোলা কোনো দয়া বা সহানুভূতির বিষয় নয়, এটা নাগরিক অধিকার। সম্প্রতি একটি রিট আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে উচ্চ আদালতের রুলে সরকারি প্রতিষ্ঠানে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতার সুবিধার্থে র্যাম্প স্থাপনের বিষয়টি উঠে আসে। আমরা আশা করি, ২০১৩ সালে প্রণীত প্রতিবন্ধী ব্যক্তির অধিকার ও সুরক্ষা আইনটির যথাযথ বাস্তবায়ন হবে।
সিটি করপোরেশন এলাকায় বেশির ভাগ হোটেল–রেস্তোরাঁ বহুতল ভবনে অবস্থিত। অপরিকল্পিতভাবে গড়ে ওঠা এসব ভবনের নকশা প্রতিবন্ধীবান্ধব নয়। স্থানীয় সরকার বিভাগের চিঠিতে বলা হয়েছে, যৌক্তিক সময়ের মধ্যে যেসব হোটেল, রেস্তোরাঁ, ক্যাফে সরকারি নির্দেশনা পালনে ব্যর্থ হবে, সেগুলোর ট্রেড লাইসেন্স বাতিল অথবা নবায়ন বাতিল করা হবে।
প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের উপযোগী অবকাঠামো তৈরি করার জন্য সময় দেওয়াটা যৌক্তিক। তবে আমরা মনে করি, যৌক্তিক সময়ের সময়সীমাটা অবশ্যই সুনির্দিষ্ট হওয়া প্রয়োজন। নতুন রেস্তোরাঁ, হোটেল, ক্যাফের অনুমোদন দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের জন্য র্যাম্প ও শৌচাগার স্থাপন একটা শর্ত হতে হবে।
প্রতিবন্ধীদের অধিকার নিয়ে কাজ করা অধিকারকর্মীরা সরকারের এ সিদ্ধান্তকে স্বাগত জানিয়েছেন। তবে র্যাম্প বানোনো মানেই যে প্রতিবন্ধী ব্যক্তিদের প্রবেশগম্যতা নিশ্চিত করা নয়, এ বিষয়ে তাঁরা সতর্ক করেছেন। আমরা মনে করি, এ সতর্কতাকে স্থানীয় সরকার, সিটি করপোরেশনসহ সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষকে আমলে নিতে হবে। কেননা, র্যাম্পটি ব্যবহারযোগ্য কি না, ঢাল কতটা, দরজা যথেষ্ট প্রশস্ত কি না, শৌচাগারে হুইলচেয়ার ঘোরানোর জায়গা আছে কি না, এসব বিষয়ও গুরুত্বপূর্ণ। ফলে শুধু চিঠি নয়, সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন করা হচ্ছে কি না, সেটা তদারক করাটাই প্রকৃত চ্যালেঞ্জ।
আমাদের নগর–পরিকল্পনায় শিশু, বয়স্ক নাগরিক, প্রতিবন্ধী ব্যক্তিরা সব সময়ই উপেক্ষিত। সমাজের সব অংশকে যুক্ত না করা গেলে, সবার অধিকার সুরক্ষিত না হলে অন্তর্ভুক্তিমূলক ও মানবিক দেশ গড়া অসম্ভব।