অনিশ্চয়তা মেনে নেওয়াই হজ
· Prothom Alo

হজ শুধু একটি ফরজ ইবাদত নয়; এটি এক দীর্ঘ আত্মিক যাত্রা। এই যাত্রায় মানুষ নিজের ভেতরের স্তরগুলো একে একে উন্মোচন করতে শেখে। একজন নারীর জন্য এই সফর আরও গভীর ও বহুমাত্রিক। এখানে শরীর, মন, বিশ্বাস আর ধৈর্যের এক কঠিন পরীক্ষা হয়।
Visit afnews.co.za for more information.
অনেকেই হজকে শুধু রীতিনীতির একটি তালিকা মনে করেন—কখন ইহরাম বাঁধতে হবে, কখন তাওয়াফ বা সাঈ করতে হবে। কিন্তু বাস্তবে হজে গিয়ে বোঝা যায়, এসবই কেবল বাহ্যিক কাঠামো।
অভ্যন্তরীণ প্রস্তুতি ছাড়া এই সফর পূর্ণতা পায় না। আর সেই প্রস্তুতির জায়গাটিই অনেক সময় অবহেলিত থেকে যায়।
আমাদের দেশের নারীদের দৈনন্দিন জীবনে দীর্ঘপথ হাঁটা বা কায়িক পরিশ্রমের অভ্যাস কম থাকে। ফলে হঠাৎ এই ধকল সইতে শরীর বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।
নিজের সীমাবদ্ধতা চেনা
হজে গিয়ে প্রথম যে বাস্তবতার মুখোমুখি হতে হয়, তা হলো শরীর। প্রচণ্ড গরম, দীর্ঘ পথ হাঁটা, ভিড় আর ঘুমের অনিয়ম শরীরকে চরম ক্লান্ত করে দেয়। বিশেষ করে আমাদের দেশের নারীদের দৈনন্দিন জীবনে দীর্ঘপথ হাঁটা বা কায়িক পরিশ্রমের অভ্যাস কম থাকে। ফলে হঠাৎ এই ধকল সইতে শরীর বিপর্যস্ত হয়ে পড়তে পারে।
তাই হজে যাওয়ার আগে থেকেই নিয়মিত হাঁটা, পর্যাপ্ত পানি পান ও ঘুমের রুটিন ঠিক রাখা জরুরি। মনে রাখতে হবে, হজ কোনো প্রতিযোগিতা নয়; এখানে ‘বেশি’ করার চেয়ে ‘সঠিকভাবে’ করা অনেক বেশি গুরুত্বপূর্ণ।
‘তোমরা দ্রুত হজ আদায় করো’নিয়ন্ত্রণ ছেড়ে দেওয়ার শিক্ষা
হজের সবচেয়ে কঠিন অংশ সম্ভবত মানসিক। আমরা যারা নিজের ঘর ও নিয়মে অভ্যস্ত, তাদের জন্য হজ একেবারে ভিন্ন অভিজ্ঞতা। এখানে কিছুই আপনার নিয়ন্ত্রণে নেই। কখন কোথায় যেতে হবে বা কতক্ষণ অপেক্ষা করতে হবে—সবই অনিশ্চিত।
এই অনিশ্চয়তাই অনেককে অস্থির করে তোলে। নারীদের ক্ষেত্রে এই চাপ কিছুটা বেশি থাকে, কারণ আমরা সাধারণত সবকিছু গুছিয়ে রাখতে পছন্দ করি। কিন্তু হজ শেখায় চেনা হিসেব ভেঙে অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়ার নামই ইবাদত। এই যাত্রার সবচেয়ে বড় পাথেয় হলো ‘সবর’ বা ধৈর্য।
হজ শেখায় চেনা হিসেব ভেঙে অনিশ্চয়তাকে মেনে নেওয়ার নামই ইবাদত। এই যাত্রার সবচেয়ে বড় পাথেয় হলো ‘সবর’ বা ধৈর্য।
তিনটি সংকট
হজে এমন কিছু সমস্যার সৃষ্টি হয়, যা আগে থেকে কল্পনা করা কঠিন:
১. ভিড় ও নিরাপত্তা: তাওয়াফ বা সাঈর সময় ভিড়ের মধ্যে নিজেকে নিরাপদ রাখা এবং দল থেকে বিচ্ছিন্ন না হওয়া খুবই গুরুত্বপূর্ণ।
২. স্বাস্থ্য সমস্যা: পানিশূন্যতা ও হিটস্ট্রোক খুব সাধারণ সমস্যা। সামান্য অসুস্থতাকেও অবহেলা করা উচিত নয়।
৩. মাসিক সংক্রান্ত জটিলতা: এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ কিন্তু অনেক নারীই বিষয়টি নিয়ে কথা বলতে দ্বিধা করেন। এর শরয়ি সমাধান ও বিকল্প পরিকল্পনা আগে থেকেই জেনে নেওয়া জরুরি।
কেমন ছিলেন সাহাবি যুগের নারীরাকয়েকটি ভুল
১. অতিরিক্ত বোঝা বহন: শুরুতে মনে হয় সব দরকারি, কিন্তু কিছুদিন পর বোঝা যায় অর্ধেক জিনিসই কাজের না। হজের শিক্ষা হলো অল্পতে চলা।
২. অন্যের সঙ্গে তুলনা: কে কত বেশি নফল ইবাদত বা তাওয়াফ করছে, তা দেখে নিজের ইবাদতকে ছোট মনে করবেন না। আল্লাহর কাছে আন্তরিকতাই মুখ্য।
৩. বিশ্রাম না নেওয়া: ক্লান্তি উপেক্ষা করে ইবাদত করাকে ‘ত্যাগ’ মনে করা ভুল। শরীর ও মনের যত্ন নেওয়াও ইবাদতের অংশ। প্রয়োজনীয় ওষুধপত্র সবসময় সঙ্গে রাখা উচিত।
হজে গিয়ে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় সমতার শক্তি। সেখানে সবাই একই পোশাকে, একই পথে। নারী-পুরুষ বা ধনী-গরিবের সব বিভাজন সেখানে মুছে যায়।
হজ সহজ করার উপায়
অল্পে তুষ্টির অভ্যাস: খাবার, পোশাক বা সময়—সবকিছুতে সহজতা বজায় রাখলে মানসিক চাপ কমে।
ছোট লক্ষ্য ঠিক করা: একসঙ্গে অনেক কিছু না করে অল্প অল্প করে কোরআন তিলাওয়াত বা দোয়ায় মন দেওয়া ভালো।
নিজের জন্য সময় রাখা: প্রচণ্ড ভিড়ের মধ্যেও কিছুটা সময় একা কাটান। চুপচাপ বসে থেকে কাবার দিকে তাকিয়ে থাকা বা আল্লাহর সঙ্গে মনে মনে কথা বলা এক অসাধারণ প্রশান্তি দেয়।
সঠিক জ্ঞান অর্জন: হজের নিয়ম ও দোয়াগুলো নিজের ভাষায় শিখলেও সমস্যা নেই। আন্তরিকতাই আসল।
নারী হিসেবে অন্যরকম উপলব্ধি
হজে গিয়ে সবচেয়ে বেশি অনুভূত হয় সমতার শক্তি। সেখানে সবাই একই পোশাকে, একই পথে। নারী-পুরুষ বা ধনী-গরিবের সব বিভাজন সেখানে মুছে যায়। পৃথিবীর নানা প্রান্তের নারীদের একসঙ্গে প্রার্থনা করতে দেখলে মনে হয়, এই উম্মাহ কত বিশাল ও বৈচিত্র্যময়।
হজ শেষ হয়, কিন্তু তার প্রভাব রয়ে যায় সারা জীবন। ফিরে এসে বোঝা যায়, পরিবর্তনটা বাইরে নয়, ভেতরে হয়েছে। হজ একজন নারীর জন্য আত্মশক্তিকে নতুন করে আবিষ্কারের সুযোগ—‘আমি তাঁর ডাকে গিয়েছিলাম এবং তিনি আমার কথা শুনেছেন।’
মারদিয়া মমতাজ: জাতীয় সংসদের সদস্য