নেইমারকে নিয়ে কেমন হলো ব্রাজিলের বিশ্বকাপের দল

· Prothom Alo

সোমবার সকাল থেকে অনেকেই চোখ রাখছিলেন ঘড়ির কাঁটায়। কেউ কেউ নিশ্চয়ই মোবাইল ফোনে অ্যালার্মও সেট করে রেখেছিলেন। রাত ২টায় কতিপয় নিশাচর মানুষ ছাড়া কে আর জেগে থাকেন!

কিন্তু ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দল তো বাংলাদেশ সময়ে ঘোষণা করবে না; ফলে নেইমার দলে আছেন কি না, তা জানতে অ্যালার্মই ভরসা। নাহ্‌, আনচেলত্তি বিশেষ কোনো চমক উপহার দেননি। জনমতকে পাশ কাটিয়ে ফিটনেস রিপোর্ট কিংবা সাম্প্রতিক সময়ে খেলার অভিজ্ঞতাকে গুরুত্বও দিতে পারেননি। ফলাফল, চতুর্থবারের মতো বিশ্বকাপ খেলতে যাচ্ছেন নেইমার। সর্বশেষ ব্রাজিলের হয়ে নেইমার খেলেছেন ২০২৩ সালের অক্টোবরে।

Visit betsport.cv for more information.

নেইমারের ব্রাজিল দলে ডাক পাওয়াটা তাঁর ভক্তদের জন্য বিশেষ আনন্দের। পাশাপাশি এটি কার্লো আনচেলত্তির দল নির্বাচনের দর্শনকেই যেন প্রতিফলিত করছে। চূড়ান্ত দল ঘোষণার আগে কিছু পজিশন নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও ইতালিয়ান কোচ শেষ পর্যন্ত ভরসা রেখেছেন পরীক্ষিত ও নির্ভরযোগ্য খেলোয়াড়দের ওপর। সে তালিকার সবচেয়ে বড় নাম নিঃসন্দেহে সান্তোসের ১০ নম্বর জার্সিধারী নেইমার।

ব্রাজিলের বিশ্বকাপ দলে খুব বেশি চমক যেমন নেই, আবার পুরোপুরি রক্ষণাত্মক দলও এটি নয়; বরং পুরোনো নির্ভরযোগ্য তারকাদের সঙ্গে নতুন শক্তির একটি ভারসাম্য তৈরির চেষ্টা করেছেন আনচেলত্তি।

নেইমারকে নিয়েই বিশ্বকাপ খেলতে যাবে ব্রাজিল

শুরুতেই আসা যাক নেতৃত্ব প্রসঙ্গে। মাঠে সব সময় নেতৃত্ব না দিলেও এই দলে নেতৃত্বের কেন্দ্রবিন্দু এখন অনেকটাই নেইমার। কারণ, এত দিন দলের প্রধান ভরসা হিসেবে দেখা রাফিনিয়া ও ভিনিসিয়ুস জুনিয়র এখনো জাতীয় দলে প্রত্যাশামতো ধারাবাহিক হতে পারেননি।

তবে এটি রিয়াল তারকা ভিনিসিয়ুস ও বার্সেলোনা উইঙ্গার রাফিনিয়ার জন্য খারাপ খবর নয়; বরং গত এক দশকের বেশি সময় ধরে ব্রাজিল ফুটবলের সবচেয়ে বড় তারকাকে পাশে পাওয়ায় চাপ কিছুটা কমেছে তাঁদের ওপর। দুজনে আরও স্বচ্ছন্দে খেলতে পারবেন। শুধু নেইমারই নন, পুরো দল নির্বাচনেই অভিজ্ঞতার ছাপ স্পষ্ট। ২৬ সদস্যের দলে ১৫ জনই খেলেছেন ২০২২ কাতার বিশ্বকাপে। এই শতকে বিশ্বকাপে ব্রাজিল দলে এত বেশি ‘অভিজ্ঞ’ খেলোয়াড় আর কখনো দেখা যায়নি। আনচেলত্তি হয়তো বুঝেছেন, বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে শুধু প্রতিভা নয়, মানসিক দৃঢ়তা এবং বড় ম্যাচ সামলানোর অভিজ্ঞতাও গুরুত্বপূর্ণ।

নেইমারেই আস্থা আনচেলত্তির

গোলকিপার বিভাগে ওয়েভারতনের অন্তর্ভুক্তি সেটারই উদাহরণ। আলিসন বেকার চোটের কারণে দীর্ঘ সময় বাইরে ছিলেন, আর এদেরসনও ধারাবাহিক নন। তাই ব্রাজিল দলে এবার তৃতীয় গোলকিপারের গুরুত্ব বেশ বেড়ে গেছে। তরুণ বিকল্পদের ওপর আস্থা রাখা কঠিন। এই জায়গার জন্য আলোচনায় থাকা বেন্তো ও হুগো সোউজা সাম্প্রতিক সময়ে বেশ কিছু ভুল করেছেন, যা সমর্থকদের উদ্বিগ্ন করে তোলে। কোচিং স্টাফরাও সম্ভবত পুরোপুরি নিশ্চিন্ত ছিলেন না।

তাই ৩৮ বছর বয়সী অভিজ্ঞ ওয়েভারতনের ওপরই ভরসা করেছেন আনচেলত্তি। তাঁর অভিজ্ঞতা ও স্থিরতা ইতালিয়ান এই কোচকে নিশ্চয়ই বাড়তি আস্থা দিয়েছে। ১৭ বছরের পেশাদার ক্যারিয়ারে ওয়েভারতন ২০১৬ সালে গ্রীষ্মকালীন অলিম্পিকে সোনা জিতেছেন এবং ২০২২ বিশ্বকাপের স্কোয়াডেও ছিলেন।

বিশ্বকাপে নেইমার: শিশুর প্রার্থনা, বাবার খোলাচিঠি ও স্পষ্টবাদী আনচেলত্তি

কোচের দায়িত্ব নেওয়ার পর থেকেই আনচেলত্তি অভিজ্ঞ ও মানসিকভাবে প্রস্তুত খেলোয়াড়দের ওপরই বেশি আস্থার ইঙ্গিত দিয়ে রেখেছিলেন। পজিশনভিত্তিক বিশ্লেষণে রক্ষণভাগ ও মাঝমাঠে তাঁর সেই বার্তারই যেন প্রতিফলন দেখা গেছে। এ দুটি জায়গায় তারুণ্য বা প্রতিভার দ্যুতির চেয়ে অভিজ্ঞতার আকরেই আশ্রয় নিয়েছেন আনচেলত্তি।

মার্কিনিওস ও গ্যাব্রিয়েলকে কেন্দ্র করে ডিফেন্স গড়া হয়েছে। মাঝমাঠে আছেন কাসেমিরো ও ব্রুনো গিমারেস। বিশেষ করে কাসেমিরোর দলে জায়গা পাওয়া দেখিয়ে দিচ্ছে, আনচেলত্তি এখনো বড় ম্যাচের অভিজ্ঞতাকে মূল্য দেন। একই কারণে দানিলো ও অ্যালেক্স সান্দ্রোর মতো খেলোয়াড়েরাও দলে জায়গা পেয়েছেন।

ব্রাজিল কোচ কার্লো আনচেলত্তি

তবে দলটি শুধু অভিজ্ঞদের নিয়েই নয়। আনচেলত্তি নতুনদের জন্যও দরজা খোলা রেখেছেন। বিশেষত ফরোয়ার্ড লাইনে ম্যাচের মোড় ঘোরাতে অভিজ্ঞতার সঙ্গে প্রতিভার মিশেল ঘটিয়েছেন ব্রাজিল কোচ। এনদ্রিক, লুইস হেনরিক, রায়ান এবং ইগর থিয়াগোর মতো তরুণদের অন্তর্ভুক্তি জানাচ্ছে, বিশ্বকাপে ম্যাচের দৃশ্যপট বদলাতে কিছু তরুণ তুর্কিকে তুরুপের তাস হিসেবে ব্যবহার করবেন আনচেলত্তি।

বিশেষ করে এনদ্রিক ব্রাজিলের আক্রমণে বাড়তি গতি ও অপ্রত্যাশিত কিছু এনে দিতে পারেন। তবে এই জায়গায় এস্তেভাও এবং রদ্রিগোর না থাকাও আনচেলত্তি ও ব্রাজিল সমর্থকদের জন্য আক্ষেপের। এস্তেভাও আনচেলত্তির অধীনে সবচেয়ে কার্যকরী হয়ে উঠেছিলেন। গোল করার পাশাপাশি সৃষ্টিশীলতার দিক থেকেও দারুণ সম্ভাবনাময় এই তরুণ। কিন্তু চোট ভেঙে দিয়েছে তাঁর বিশ্বকাপ–স্বপ্ন।

সব মিলিয়ে ব্রাজিলের এই দল ‘গ্যালাকটিকো’ ধরনের ঝলমলে স্কোয়াড নয়; বরং বাস্তবমুখী একটি দল। এখানে প্রতিভা আছে, অভিজ্ঞতা আছে, আবার কিছু অনিশ্চয়তাও আছে। সবচেয়ে বড় প্রশ্ন রয়ে গেছে নেইমারের শারীরিক অবস্থা এবং ভিনিসিয়ুসদের ধারাবাহিকতা নিয়ে। তবে আনচেলত্তির মতো অভিজ্ঞ কোচের অধীনে দলটি অন্তত আগের চেয়ে বেশি ভারসাম্যপূর্ণ ও পরিণত মনে হচ্ছে। এই ব্রাজিল হয়তো ২০০২ সালের মতো ভয়ংকর আক্রমণাত্মক নয়, কিন্তু বিশ্বকাপের মতো টুর্নামেন্টে অনেক সময় এমন পরিণত, সংগঠিত দলই শেষ পর্যন্ত সবচেয়ে বিপজ্জনক হয়ে ওঠে।

Read full story at source