স্মার্ট লেনদেনে বদলেছে কেনাকাটা
· Prothom Alo

ছোট-বড় কেনাকাটায় নগদ টাকার ব্যবহার দিনে দিনে কমে আসছে। কারণ, এখন বাসাবাড়ির পাশের দোকানে বা শপিং মলে হরহামেশা ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড, মোবাইল ব্যাংকিং সেবা বা অ্যাপস ব্যবহার করে লেনদেন করা যাচ্ছে। বিক্রেতা ও সেবাদাতা প্রতিষ্ঠানগুলো টাকা গ্রহণে পয়েন্ট অব সেলস (পিওএস) বা কিউআর কোড ব্যবহার করছে।
এতে একদিকে খুচরা টাকার ঝামেলা নাই হয়ে যাচ্ছে, অন্যদিকে পুরোনো বা জাল টাকার ঝুঁকিও নেই। ফলে কেনাকাটায় ডিজিটাল লেনদেন দিনে দিনে বাড়ছে; যা ক্যাশলেস বাংলাদেশ গঠনে ইতিবাচক ভূমিকা রাখছে। উৎসবে ডিজিটাল কেনাকাটায় মিলছে নানা ছাড় ও অফার, যা গ্রাহকদের আরও উৎসাহিত করছে।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
এভাবে ডিজিটাল কেনাকাটায় প্রতি মাসে ১২ হাজার কোটি টাকার বেশি লেনদেন হচ্ছে। গত মার্চের হিসাবে মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে (বিকাশ, রকেট, নগদ, উপায়) কেনাকাটা ও সেবা বিল পরিশোধ হয়েছে ৪ হাজার ৮২১ কোটি টাকা। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে পয়েন্ট অব সেলসের কেনাকাটার বিল পরিশোধ করা হয়েছে ৪ হাজার ৭৪২ কোটি টাকার। ইন্টারনেট ব্যাংকিং সেবা ব্যবহার করে ই-কমার্সে কেনাকাটার বিল পরিশোধ করা হয়েছে ২ হাজার ২৬৮ কোটি টাকা। এদিকে অ্যাপস দিয়ে কিউআর কোডের মাধ্যমে বিল বা কেনাকাটা করা হয়েছে ২১৭ কোটি টাকা।
দেশে এসব সেবা চালুর পরপরই মূলত করোনাভাইরাসের কারণে ২০২০ ও ২০২১ সালেই ডিজিটাল লেনদেনে নতুন মাত্রা হয়েছে। যেমন সরকারের দেওয়া বিভিন্ন সামাজিক নিরাপত্তা ভাতার পুরোটাই এখন মোবাইল ব্যাংকিং সেবার মাধ্যমে বিতরণ করা হয়। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নানা উদ্যোগে ডিজিটাল লেনদেন গতি পাচ্ছে। নগদ টাকার ব্যবহার কমিয়ে এনে ডিজিটাল লেনদেন জোরদারে কাজ করছে কেন্দ্রীয় ব্যাংক।
মোটাদাগে ডিজিটাল লেনদেনকে কয়েকটি ধাপে ভাগ করা যায়। এগুলো হলো বিকাশ, নগদ ও রকেটের মতো সেবায় নগদ টাকা জমা দেওয়া এবং উত্তোলন ছাড়া বিভিন্ন ধরনের কেনাকাটা ও পরিষেবার বিল পরিশোধ হয়, তা সবই ডিজিটাল লেনদেন। আর মার্চেন্ট পেমেন্ট হলো পুরোটাই কেনাকাটা বা সেবা বিল পরিশোধ। ডেবিট ও ক্রেডিট কার্ডের মাধ্যমে পয়েন্ট অব সেলসে (পিওএস) লেনদেন। এখন কিউআর কোডেও ভালো পরিমাণ লেনদেন হচ্ছে। এ ছাড়া ই–কমার্স তথা অনলাইনভিত্তিক লেনদেন বাড়ছে। এমনকি দৈনন্দিন খরচও ব্যয় হচ্ছে স্মার্ট লেনদেনে।
একটি ব্যবসায়িক প্রতিষ্ঠানে কর্মরত শফিউল আলমের বেতন হয় ব্যাংক হিসাবে। শফিউল আলম নিজে বাসাভাড়া ও বিভিন্ন পরিষেবার বিল পরিশোধ করেন ব্যাংকিং অ্যাপস ও বিকাশের মাধ্যমে। তিনি কেনাকাটা করেন ব্যাংকের কার্ড ব্যবহার করে। এর বাইরে হাত খরচ ও জরুরি প্রয়োজন মেটাতে তিনি প্রতি মাসের শুরুতে অল্প কিছু টাকা ব্যাংক থেকে তোলেন।
আলাপকালে শফিউল আলম প্রথম আলোকে বলেন, আগে পুরো টাকা চেকের মাধ্যমে ব্যাংক থেকে তুলে আনতাম। সারা মাস ধরে তা খরচ করতাম। এখন তেমন টাকা তোলা লাগে না। সামনে এমন দিন আসবে, প্রতি মাসের নির্দিষ্ট খরচ স্বয়ংক্রিয়ভাবে হিসাব থেকে কেটে রাখা হবে।
সেবাদাতারা বিভিন্ন ধরনের নতুন নতুন পণ্য চালু করার ফলে গ্রাহকেরা দিন দিন ডিজিটাল লেনদেনে অধিকতর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছেন। এখন বিদেশের মতো দেশেও উবার, পাঠাও এবং সিএনজির ভাড়া মুঠোফোনের মাধ্যমে পরিশোধ করা যাচ্ছে। এমনকি রাজধানীর বাইরে অলিগলির দোকানেও আজকাল বিল দেওয়া যাচ্ছে বিকাশ, রকেট ও নগদের মতো সেবার মাধ্যমে। এতে ডিজিটাল লেনদেনে নতুন মাত্রা যোগ হচ্ছে। এ জন্য সেবা প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো চালু করেছে নিজস্ব অ্যাপস।
গ্রাহকেরা নগদ টাকার ব্যবহার ছাড়াই কেনাকাটা ও সেবার বিল পরিশোধ, টিকিট ক্রয় বাবদ এসব লেনদেন করেছেন। এখন ব্যাংকগুলো গ্রাহকদের ইন্টারনেট ব্যাংকিং সুবিধা দিচ্ছে। এ জন্য তারা নিজস্ব অ্যাপস চালু করেছে। এর মধ্যে ডাচ্–বাংলা নেক্সাস পে, সিটি ব্যাংকের সিটি টাচ, ব্র্যাক ব্যাংকের আস্থা, ইসলামী ব্যাংকের সেলফিন, ইস্টার্ন ব্যাংক লিমিটেডের (ইবিএল) স্কাই ব্যাংকিং, ঢাকা ব্যাংকের গো, ব্যাংক এশিয়ার স্মার্ট অ্যাপ, যমুনা ব্যাংকের জাস্ট পে এখন বেশ জনপ্রিয়।
ব্যাংকাররা বলছেন, ডিজিটাল লেনদেনের অবকাঠামোর যত উন্নয়ন হবে, নগদ টাকার লেনদেন তত কমে আসবে। এ জন্য দীর্ঘ মেয়াদে বড় বিনিয়োগের পাশাপাশি সরকারি নীতি সহায়তাও প্রয়োজন। পাশাপাশি গ্রাহকদেরও ডিজিটাল উপায়ের আর্থিক লেনদেন সম্পর্কে মৌলিক কিছু শিক্ষা দিতে হবে, যাতে তাঁরা স্বচ্ছন্দে সেবা নিতে পারেন।
গবেষণা ও নীতিসহায়ক সংস্থা ইনস্টিটিউট ফর ইনক্লুসিভ ফিন্যান্স অ্যান্ড ডেভেলপমেন্টের (আইএনএফ) নির্বাহী পরিচালক মোস্তফা কে মুজেরী প্রথম আলোকে বলেন, ডিজিটাল লেনদেন যত বেশি বাড়বে, আর্থিক স্বচ্ছতা তত নিশ্চিত হবে, যা বৈষম্য কমাতেও কাজে দেবে। ডিজিটাল সেবা ঘরে বসে নেওয়া যায়, ফলে বিশেষ সুবিধা কেউ পাবে না। এতে অনিয়মও দূর হবে। এ জন্য সরকারের নীতিসহায়তার পাশাপাশি প্রণোদনা দিতে হবে।