পাখি কেন ঘুমের মধ্যে ডাল থেকে পড়ে যায় না

· Prothom Alo

বাসে বা ক্লাসে বসে একটু ঘুম এলেই আমাদের মাথা এদিক-ওদিক দুলতে থাকে। মাঝেমধ্যে তো ঘুমের ঘোরে সিট থেকেই পড়ে যাওয়ার দশা হয়। কিন্তু কখনো কি ভেবে দেখেছ, একটা পাখি গাছের চিকন ডালে বসে ঘুমালেও কেন নিচে পড়ে যায় না? বাদুড় তো উল্টো ঝুলে ঘুমিয়ে কাটায়। কিন্তু কীভাবে এটা ওরা করে?

ঘুমের সময় শরীরের পেশিগুলো শিথিল হয়ে যায়। এ অবস্থায় সরু ডালে ভারসাম্য বজায় রাখা মোটেও সহজ নয়। যাঁরা কোথাও দাঁড়িয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করেছেন, তাঁরা এই সমস্যা ভালো বোঝেন। কিন্তু পাখিরা এদের পায়ের এক বিশেষ কৌশলে এ সমস্যার সমাধান করে।

Visit betsport24.es for more information.

পাখিরা যখন ডালে বসে, তখন এদের নখরগুলো নিজে থেকেই ডালটিকে শক্ত করে আটকে ধরে। পাখিকে আলাদা করে কোনো শক্তি প্রয়োগ করতে হয় না। এই কাজ করে ফ্লেক্সর টেন্ডন। টেন্ডন হলো এমন একধরনের টিস্যু, যা পেশিকে হাড়ের সঙ্গে যুক্ত রাখে।

বেশির ভাগ পাখির পায়ের সামনে তিনটি এবং পেছনে একটি আঙুল থাকে। এই আঙুলগুলো একটি টেন্ডনের মাধ্যমে হাঁটুর সঙ্গে যুক্ত থাকে। যখন পাখি হাঁটু ভাঁজ করে ডালে বসে, তখন এই টেন্ডন টান টান হয়ে যায়। ফলে আঙুলগুলো স্বয়ংক্রিয়ভাবে বেঁকে গিয়ে ডালটিকে ধরে রাখে। যতক্ষণ না পাখিটি পা সোজা করছে, ততক্ষণ এই পেশি আলগা হয় না।

সাবমেরিন চালিয়ে সমুদ্রের নিচে টিয়া পাখি

পাখিদের এই আটকে থাকার প্রক্রিয়াটি আরও শক্তিশালী হয় এদের টেন্ডনের গঠনের কারণে। অন্যান্য প্রাণীর টেন্ডন মসৃণ হলেও পাখিদের টেন্ডনের ওপরের আবরণ অমসৃণ হয়। এই অমসৃণ পৃষ্ঠ টেন্ডনের সঙ্গে ঘর্ষণ তৈরি করে পাটিকে নির্দিষ্ট জায়গায় আটকে রাখতে সাহায্য করে। এই অটোমেটিক লকিং সিস্টেম এতটাই কার্যকর যে কিছু পাখি উল্টো হয়ে ঝুলে থাকলেও পড়ে যায় না।

বেশির ভাগ পাখির পায়ের সামনে তিনটি এবং পেছনে একটি আঙুল থাকে

এই বিশেষ ক্ষমতা কেবল ঘুমের জন্যই এমন নয়। শিকারি পাখিদের জন্যও খুব জরুরি। এর মাধ্যমেই ইগল বা বাজপাখি এদের শিকারকে শক্ত করে ধরে উড়ে যেতে পারে। এ ছাড়া গাছে চড়া, সাঁতার কাটা বা পানির ওপর দিয়ে হাঁটার সময়ও এই কৌশল পাখিদের সাহায্য করে।

এত দিন ধারণা করা হতো, সব পাখিই স্বয়ংক্রিয়ভাবে ডাল আঁকড়ে ধরে ঘুমায়। কিন্তু ২০১২ সালের একটি গবেষণায় দেখা গেছে, ইউরোপীয় শালিকরা ঘুমানোর সময় এ পদ্ধতি ব্যবহার করে না। গবেষকেরা পর্যবেক্ষণে লক্ষ করেছেন, ঘুমানোর সময় ইউরোপীয় শালিকের হাঁটু খুব সামান্য বাঁকানো থাকে, যা ডাল আঁকড়ে ধরার জন্য যথেষ্ট নয়।

এসব ক্ষেত্রে পাখির আঙুলগুলো মূলত সোজাই থাকে এবং এরা পায়ের পাতার মাঝখানের নরম অংশের ওপর ভর দিয়ে ভারসাম্য রক্ষা করে। এমনকি এসব পাখিকে অচেতন করার পর দেখা গেছে, এরা আর ডালের ওপর ভারসাম্য ধরে রাখতে পারছে না। এর মানে পাখিরা কেবল হাড় বা টেন্ডনের গঠন দিয়েই গাছের ডালে ঝুলে থাকে, এমন নয়; বরং আরও কিছু উপায়ে এই কাজটা করে থাকে।

পাখি দেখা মস্তিষ্ককে যেভাবে বদলে দেয়

যেসব পাখির নিজে নিজে ডাল আঁকড়ে ধরার ক্ষমতা নেই, এদের ঘুমের মধ্যেও পেশি কিছুটা শক্ত রাখতে হয়। হাঁস, ফ্লেমিংগো বা ফ্রিগেট পাখির ওপর করা গবেষণা থেকে জানা যায়, পাখিরা প্রয়োজনে এদের পেশি শক্ত করে রাখতে পারে। এর বড় একটি কারণ, পাখিরা এদের মস্তিষ্কের একটি অংশ জাগিয়ে রেখে ঘুমাতে পারে। এদের গভীর ঘুমের সময়কালও খুব অল্প সময়ের হয়। এক পায়ে দাঁড়িয়ে ভারসাম্য রক্ষার জন্যও এদের সামান্য পেশি টানের প্রয়োজন হয়।

পাখি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় প্রাণীগোষ্ঠী

ডালে বসা পাখিদের নিতম্ব বা কোমরের কাছে একটি অনন্য অঙ্গ থাকে। একে বলা হয় লুম্বোস্যাক্রাল অঙ্গ। মাথার ভেতরে থাকা ভারসাম্য রক্ষার ব্যবস্থার পাশাপাশি এই অঙ্গ পাখিকে স্থির থাকতে সাহায্য করে। বিশেষ করে পাখি যখন এর মাথা গুটিয়ে ঘুমায়, তখন কোমরের এই বিশেষ ব্যবস্থা একে পড়ে যাওয়া থেকে রক্ষা করে। বিজ্ঞানীরা মনে করেন এ নিয়ে আরও গবেষণার প্রয়োজন রয়েছে।

পাখি বিশাল ও বৈচিত্র্যময় প্রাণীগোষ্ঠী। প্রজাতিভেদে এদের শারীরিক গঠন ও আচরণ ভিন্ন। উটপাখির মতো বড় পাখি কখনো গাছে চড়ে ঘুমায় না। এরা মাটিতে বা ঝোপঝাড়ের আড়ালে ঘুমায়। আবার ফ্লেমিংগোর মতো পাখি অগভীর পানিতে এক পায়ে দাঁড়িয়ে বিশ্রাম নেয়। পাখির পায়ের আকৃতি এবং এরা কোন পরিবেশে থাকে, এর ওপর নির্ভর করে এদের দাঁড়ানোর ভঙ্গি ভিন্ন হতে পারে।

সূত্র: সায়েন্স এবিসি, সিএনআরএস নিউজপাখি কীভাবে জানে, কখন ও কোথায় পরিযায়ী হতে হবে

Read full story at source