তরুণদের ‘মানি ম্যানেজমেন্ট’ কৌশল
· Prothom Alo

লেখাটি ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে প্রকাশিত বন্ধুসভা জাতীয় পরিচালনা পর্ষদের তারুণ্য ম্যাগাজিনের একাদশ সংখ্যা থেকে নেওয়া।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক রূপান্তরযাত্রায়। গ্রামীণ কৃষিনির্ভরতা থেকে নগরকেন্দ্রিক সেবা ও প্রযুক্তিনির্ভর অর্থনীতিতে দ্রুত এগিয়ে যাচ্ছে। সঙ্গে পাল্লা দিয়ে বেড়েছে তরুণ জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ—চাকরি, ব্যবসা, ফ্রিল্যান্সিং কিংবা স্টার্টআপ; সব ক্ষেত্রেই আজ তারা প্রধান চালিকা শক্তি। কিন্তু দুঃখজনক বাস্তবতা হলো, অনেক তরুণের মধ্যেই ‘অর্থ ব্যবস্থাপনা’ বা ‘মানি ম্যানেজমেন্ট’ সম্পর্কে স্পষ্ট ধারণার ঘাটতি রয়েছে। ফলে আয় বাড়লেও সঞ্চয় বাড়ে না। একসময় আর্থিক ঝুঁকির মুখে পড়ে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। তাই অনেক ক্ষেত্রে তরুণেরা তাদের পূর্ণ কর্মক্ষমতাকে ব্যবহার করতেও পারছে না।
Visit asg-reflektory.pl for more information.
বাংলাদেশে প্রতিবছর ২০ লাখের বেশি তরুণ নতুন করে কর্মজীবনে প্রবেশ করে। কেউ সরকারি বা বেসরকারি চাকরিতে, কেউ উদ্যোক্তা হিসেবে, আবার কেউ ফ্রিল্যান্স বা রিমোট ওয়ার্কে। কিন্তু প্রথম আয় হাতে পেয়েই বেশির ভাগ তরুণ খরচের হিসাব হারিয়ে ফেলে। উপরন্তু নতুন ফোন কেনা, ঘুরতে যাওয়া, অনলাইন শপিং কিংবা ঋণ নিয়ে লাইফস্টাইল বাড়ানোর প্রবণতা দেখা যায়।
এই অবস্থা তৈরির পেছনে তিনটি বড় কারণ আছে। প্রথমত, আর্থিক শিক্ষার অভাব— স্কুল বা বিশ্ববিদ্যালয়ে ফাইন্যান্স বা পার্সোনাল বাজেটিং শেখানো হয় না। দ্বিতীয়ত, সামাজিক প্রভাব— তরুণেরা নিজেদের জীবনযাত্রাকে অন্যের সঙ্গে তুলনা করতে গিয়ে ‘লাইফস্টাইল ইনফ্লেশন’-এ পড়ে যায়। তৃতীয়ত, দীর্ঘমেয়াদি ভাবনার ঘাটতি—অবসরকালীন সঞ্চয়, ইনভেস্টমেন্ট বা বিমা নিয়ে তরুণদের মধ্যে সচেতনতা এখনো সীমিত।
ফলে দেখা যায়, আয় যত বাড়ে খরচও ততই বেড়ে যায়। ব্যাংক হিসাব খালি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে ক্রেডিট কার্ডের বিল বাড়ে আর ভবিষ্যতের স্বপ্নগুলো ধীরে ধীরে অনিশ্চিত হয়ে পড়ে। বাংলাদেশের বর্তমান পটভূমিতে মুদ্রাস্ফীতি, চাকরির অনিশ্চয়তা এবং জীবনযাত্রার ব্যয় বৃদ্ধি—সব মিলিয়ে তরুণদের জন্য অর্থনৈতিক স্থিতি বজায় রাখা আরও কঠিন হয়ে পড়েছে। ২০২৫ সালে নগর এলাকায় একজন তরুণ পেশাজীবীর মাসিক আয় যেখানে গড়ে ৩০ থেকে ৬০ হাজার টাকার মধ্যে, সেখানে জীবনযাত্রার ব্যয়েই (বাসাভাড়া, খাদ্য, পরিবহন, মোবাইল ইন্টারনেট ইত্যাদি) একটা বড় অংশ চলে যাচ্ছে। এখন তরুণেরা যদি পরিকল্পিতভাবে মানি ম্যানেজমেন্ট না শেখে, তবে ভবিষ্যতে সমাজেসঞ্চয়হীনতা, ঋণনির্ভর জীবনযাপন, মানসিক চাপ এবং অবসরকালীন অনিশ্চয়তা প্রকট আকারে দেখা দেবে। তাই তরুণদের মানি ম্যানেজমেন্টের কৌশল শেখা জরুরি। কৌশলগুলো জেনে নেওয়া যাক।
সচেতনতা
অর্থ ব্যবস্থাপনা মানে কেবল সঞ্চয় নয়, এটি একটি দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা। একজন তরুণের প্রথম কাজ হওয়া উচিত নিজের আয় ও ব্যয়ের স্পষ্ট হিসাব রাখা। প্রতি মাসের শুরুতে একটি সহজ সূত্র অনুসরণ করা যেতে পারে। ৫০-৩০-২০ নিয়ম। ৫০ শতাংশ খরচ প্রয়োজনীয় বিষয় (বাসা, খাবার, যাতায়াত, বিল), ৩০ শতাংশ ব্যয় নিজের পছন্দের জিনিসে (বিনোদন, শখ) আর বাকি ২০ শতাংশ সঞ্চয় ও বিনিয়োগে। অনেকেই সঞ্চয় ও বিনিয়োগকে এক করে দেখে। এটা মোটেই ঠিক নয়। দুটোই আলাদা এবং ভীষণ দরকারি।
সূত্রটি যেভাবে বাস্তবায়নের সুবিধার্থে মোবাইল ব্যাংকিং বা ফাইন্যান্স অ্যাপে মাসিক ব্যয় ট্র্যাক করা যেতে পারে। অ্যাপে প্রতিটি ব্যয়ের ক্যাটাগরি আলাদা করে হিসাব রাখা যায়।
সঞ্চয়ের অভ্যাস
বাংলাদেশে এখন মোবাইল ফাইন্যান্সিয়াল সার্ভিস (বিকাশ, নগদ, রকেট) তরুণদের হাতে পৌঁছে দিয়েছে ডিজিটাল সঞ্চয়ের সুযোগ। কেউ চাইলে ‘অটো সেভ’ ফিচার ব্যবহার করে মাসের নির্দিষ্ট অংশ জমা রাখতে পারে। তা ছাড়া ব্যাংকের সঞ্চয়ী হিসাব, ডিপিএস, কিংবা সরকারি সঞ্চয়পত্র তরুণদের জন্য নিরাপদ মাধ্যম হতে পারে।
সঞ্চয়ের পাশাপাশি বিনিয়োগ-সচেতনতাও দরকার। শেয়ারবাজার, মিউচুয়াল ফান্ড বা বন্ড—তিনটি ক্ষেত্রেই ছোট অঙ্কে বিনিয়োগ শুরু করা যেতে পারে। তবে শেয়ারবাজারে বিনিয়োগের আগে অন্তত বনিয়াদি ফাইন্যান্স ও রিস্ক ম্যানেজমেন্ট সম্পর্কে জ্ঞান থাকা জরুরি। কয়েকজন মিলে জমি কিনে রাখা যেতে পারে। নতুন স্টার্টআপে বিনিয়োগ করা যেতে পারে। এ ক্ষেত্রে অবশ্যই ঝুঁকি বুঝে এবং সব অর্থ এক জায়গায় বিনিয়োগ করা থেকে বিরত থাকা উচিত। মনে রাখতে হবে, বিনিয়োগ করা ভালো, কারণ বিনিয়োগ না করলে জমানো অর্থ প্রকৃত অর্থে কমতে থাকবে।
জরুরি তহবিল তৈরি
অপ্রত্যাশিত পরিস্থিতি, যেমন চাকরি হারানো, অসুস্থতা বা দুর্ঘটনা—এসবের জন্য একটি ‘ইমার্জেন্সি ফান্ড’ থাকা উচিত। সাধারণভাবে বলা হয়, অন্তত তিন থেকে ছয় মাসের খরচের সমান টাকা আলাদা করে রাখা উচিত। এতে আর্থিক চাপ কমে এবং অনিশ্চয়তার সময়েও মানসিক স্থিরতা বজায় থাকে।
ঋণ ও ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারে তরুণদের মধ্যে সতর্কতার অভাব লক্ষ করা যায়। অনেকে কার্ডের ঋণের টাকাকে নিজের টাকা ভেবে নেন। কিন্তু ঋণ আসলে ঋণই। আর ঋণ নিয়ে বিনিয়োগ ভোগ করলে তা একসময় বিপদ বয়ে আনতে পারে।
তাই ক্রেডিট কার্ড ব্যবহারের ক্ষেত্রে যতটা দরকার, ততটুকুই খরচ করা উচিত। মাস শেষে সম্পূর্ণ বিল পরিশোধের অভ্যাস গড়ে তোলার পাশাপাশি অপ্রয়োজনীয় ইএমআই বা কিস্তিতে কেনাকাটা থেকে বিরত থাকা ভালো।
ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
মানি ম্যানেজমেন্টের শেষ ধাপ হলো ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা। নিজের শিক্ষা, পরিবার, অবসর বা ব্যবসার জন্য দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য নির্ধারণ করা। কেউ চাইলে প্রতি মাসে ছোট অঙ্কে SIP (Systematic Investment Plan) বা মিউচ্যুয়াল ফান্ডে বিনিয়োগ শুরু করতে পারে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের নিয়ম অনুযায়ী, শেয়ারবাজারে বিনিয়োগ এখন অনেক বেশি স্বচ্ছ ও ডিজিটাল। তরুণেরা যদি ধৈর্য ধরে ‘লং টার্ম ইনভেস্টর’ হিসেবে বাজারে থাকে, তবে তা তাদের ভবিষ্যতের জন্য এক শক্তিশালী সম্পদভিত্তি হতে পারে।
টিপস
ডিজিটাল যুগের সুবিধা নিয়ে আর্থিক শিক্ষার সুযোগ এখন অনেক। ইউটিউব, ফেসবুক, কিংবা কোরসেরার মতো অনলাইন প্ল্যাটফর্মে বিনা মূল্যে পাওয়া যায় শত শত পারসোনাল ফাইন্যান্স কোর্স।
বাংলাদেশের পটভূমিতে প্রথম আলো বন্ধুসভাসহ বেশ কিছু বিশ্ববিদ্যালয় ক্লাবও তরুণদের ফাইন্যান্স সচেতনতা তৈরিতে ভূমিকা রাখছে। তরুণেরা চাইলে মাসে অন্তত এক ঘণ্টা সময় ব্যয় করে অর্থ ব্যবস্থাপনা শেখার অভ্যাস তৈরি করতে পারে।
মনে রাখতে হবে, বাংলাদেশের ৬৫ শতাংশ জনগণ এখন ৩৫ বছরের নিচে অর্থাৎ ভবিষ্যৎ অর্থনীতির দিকনির্দেশনা তরুণদের হাতে। আর এই শক্তিকে টেকসই করতে হলে তরুণদের অর্থনৈতিকভাবে সচেতন ও দায়িত্বশীল হতে হবে। মানি ম্যানেজমেন্ট কেবল টাকার হিসাব নয়; এটি আত্মনির্ভরশীলতা, দায়িত্ববোধ এবং ভবিষ্যতের জন্য সচেতন থাকার শিক্ষা। আর যে তরুণ নিজের আয়-ব্যয়ের হিসাব রাখে, সঞ্চয়ের অভ্যাস গড়ে তোলে, বিনিয়োগের জ্ঞান অর্জন করে, আগামীকাল সে-ই একজন সফল, স্থিতিশীল ও দায়িত্ববান নাগরিক হয়ে উঠবে, এ আশা রাখাই যায়।
সহযোগী অধ্যাপক, ফাইন্যান্স বিভাগ, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি