বজ্রপাতে পুরো ফুটবল টিম নিহত হয়েছিল যে ম্যাচে
· Prothom Alo

ফুটবল মাঠে কত অদ্ভুত ঘটনাই তো ঘটে! কখনো অভাবনীয় গোল, কখনো লাল কার্ডের ছড়াছড়ি, আবার কখনো দর্শকদের মাঠে ঢুকে পড়া। কিন্তু আজ এমন এক ফুটবল ম্যাচের কথা বলব, যা বিশ্বাস করতেও কষ্ট হবে। এক ম্যাচে বজ্রপাতে একটি দলের ১১ জন খেলোয়াড়ই মারা গিয়েছিলেন, অথচ প্রতিপক্ষ দলের একজন খেলোয়াড়েরও আঁচড় পর্যন্ত লাগেনি?
শুনতে অদ্ভুত লাগছে ঠিকই, কিন্তু ঘটনা সত্যি। আজ থেকে প্রায় পঁচিশ বছর আগের একটি সত্যিকারের ঘটনা এটি। এই ঘটনা পুরো ফুটবল বিশ্বকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল। চলো, সেই ম্যাচের কথা এবং প্রতিপক্ষের সবার বেঁচে যাওয়ার রহস্য জানা যাক।
Visit mchezo.co.za for more information.
ঘটনাটি ঘটেছিল ১৯৯৮ সালের অক্টোবর মাসে। আফ্রিকার দেশ ডেমোক্রেটিক রিপাবলিক অব কঙ্গোর (ডিআর কঙ্গো) কাসাই প্রদেশের একটি গ্রামে এই ফুটবল ম্যাচের আয়োজন করা হয়েছিল। ম্যাচটি চলছিল স্থানীয় দুটি দল বেনা শাদি এবং বাসাঙ্গার মধ্যে। এখানে জানিয়ে রাখি, ২০২৬ বিশ্বকাপে কিন্তু ডিআর কঙ্গো প্রথমবারের মতো বিশ্বকাপে সুযোগ পেয়েছে।
এবার আসল কাহিনিতে ফেরা যাক। সেদিন ঠিক কী হয়েছিল?
মাঠে তুমুল উত্তেজনা। দুই দলের হাড্ডাহাড্ডি লড়াই চলছিল। খেলার স্কোর তখন ১-১ সমতায়। এমন সময় হঠাৎ আকাশ কালো করে মেঘ ঘনিয়ে এল। শুরু হলো প্রবল ঝড়বৃষ্টি। খেলোয়াড়েরা বৃষ্টি উপেক্ষা করেই খেলা চালিয়ে যাচ্ছিলেন।
ফুটবলে ফ্যাসিজমের ছায়াহঠাৎ করে পুরো মাঠ আলো করে বিকট শব্দে একটি বজ্রপাত আছড়ে পড়ল ঠিক মাঝমাঠে! চারপাশ ঢেকে গেল ধোঁয়ায়। কয়েক মুহূর্ত পর ধোঁয়া কাটতেই গ্যালারির দর্শকেরা এক ভয়াবহ দৃশ্য দেখতে পেলেন। স্বাগতিক বেনা শাদি দলের ১১ জন খেলোয়াড়ই মাটিতে লুটিয়ে পড়েছেন। বজ্রপাতের প্রচণ্ড আঘাতে ঘটনাস্থলেই তাঁদের সবার মৃত্যু হয়! শুধু তা-ই নয়, মাঠের আশপাশে থাকা আরও প্রায় ৩০ জন দর্শক মারাত্মক দগ্ধ হন।
কিন্তু সবচেয়ে বড় বিস্ময়কর ব্যাপারটি ঘটেছিল এরপর। সবাই খেয়াল করে দেখলেন, প্রতিপক্ষ বাসাঙ্গা দলের ১১ জন খেলোয়াড়ের একজনও মারা যাননি। এমনকি তাঁদের শরীরে বজ্রপাতের সামান্য আঁচড়ও লাগেনি! তারা সবাই পুরোপুরি অক্ষত ছিলেন।
রহস্যটা এখানেই। একই মাঠে, পাশাপাশি খেলা করা ২২ জন খেলোয়াড়ের মধ্যে শুধু ১১ জনের ওপর বাজ পড়ল, আর বাকি ১১ জন বেঁচে গেল কীভাবে? এমন ঘটনা তো সাধারণ চোখে মেনে নেওয়া কঠিন। এর পেছনে আসলে কারণ কী ছিল?
আসল কারণে যাওয়ার আগে স্থানীয় লোকজনের কুসংস্কারে বিশ্বাসের কথাটা শোনো। ডিআর কঙ্গোর ওই অঞ্চলগুলোতে সে সময় জাদুটোনা বা কালোজাদুর প্রতি মানুষের প্রচণ্ড বিশ্বাস ছিল। ঘটনা ঘটার পরপরই স্থানীয় লোকজন বিশ্বাস করতে শুরু করে, বাসাঙ্গা দল নিশ্চয়ই কোনো ভয়ংকর কালোজাদু বা ডাকিনিবিদ্যার আশ্রয় নিয়েছে। তাদের ধারণা ছিল, প্রতিপক্ষ জাদু করেই বজ্রপাতকে বেনা শাদি দলের দিকে ছুড়ে দিয়েছে! ঘটনাটি এতটাই অদ্ভুত ছিল যে স্থানীয় পত্রিকাগুলোও একে কালোজাদুর প্রভাব বলে খবর ছাপাতে শুরু করে।
কিন্তু কালোজাদু বাদ দিয়ে একটু বিজ্ঞানের দৃষ্টিতে রহস্যটা দেখা যাক। বিজ্ঞান তো আর জাদুটোনা বিশ্বাস করে না। বিজ্ঞানীরা যখন এই ঘটনার যৌক্তিক কারণ খুঁজতে গেলেন, তখন বেরিয়ে এল এক চমকপ্রদ তথ্য। আসল কারণটি লুকিয়ে ছিল খেলোয়াড়দের পায়ে পরা ফুটবল বুটে!
সারা দিন গেম খেললে রাতে চোখ বন্ধ করলে কেন সেই গেম দেখা যায়ফুটবল খেলার বুটের নিচে মাটির সঙ্গে গ্রিপ ধরে রাখার জন্য ছোট ছোট কাঁটার মতো অংশ থাকে, যাকে স্পাইক বলে। তদন্তে ধারণা করা হয়, যে দলটির সবাই মারা গিয়েছিলেন, সেই দলের খেলোয়াড়দের বুটের স্পাইকগুলো ছিল স্টিল বা লোহার তৈরি।
অন্যদিকে যে দলটি পুরোপুরি বেঁচে গিয়েছিল, তাদের বুটের স্পাইকগুলো ছিল প্লাস্টিক বা রাবারের তৈরি। এমনকি তাদের দলের অনেকেই সেদিন খালি পায়ে খেলছিলেন!
আমরা সাধারণ বিজ্ঞানের বইয়ে পড়েছি, লোহা বা ধাতব পদার্থ বিদ্যুৎ সুপরিবাহী। অন্যদিকে প্লাস্টিক, রাবার বা চামড়া বিদ্যুৎ পরিবাহী নয়। বজ্রপাতের সময় আকাশ থেকে যে বিপুল পরিমাণ বৈদ্যুতিক শক্তি মাটিতে নেমে আসে, তা সব সময় এমন কোনো পথ খোঁজে, যার ভেতর দিয়ে খুব সহজে প্রবাহিত হওয়া যায়। বেনা শাদি দলের খেলোয়াড়দের পায়ে লোহার স্পাইক থাকায়, সেটি বিদ্যুতের জন্য একটি নিখুঁত পরিবাহী হিসেবে কাজ করেছিল। ফলে বজ্রপাতের বিপুল বিদ্যুৎ প্লাস্টিকের স্পাইক পরা খেলোয়াড়দের এড়িয়ে লোহার স্পাইক পরা খেলোয়াড়দের শরীরের ভেতর দিয়ে মাটিতে প্রবেশ করে। আর তাতেই মুহূর্তের মধ্যে ১১ জন তরুণের মর্মান্তিক মৃত্যু ঘটে।
একটি সাধারণ ফুটবল বুটের স্পাইক কীভাবে প্রকৃতির এমন ভয়ংকর নিয়মের সঙ্গে মিলে গিয়ে এক দলের পুরো ১১ জনের প্রাণ কেড়ে নিল, তা আজও বিজ্ঞান ও ফুটবলের ইতিহাসে এক বিশাল বিস্ময় হয়ে আছে।
এই মর্মান্তিক ঘটনাটি ১৯৯৮ সালের ২৮ অক্টোবর নানা সংবাদমাধ্যমে প্রকাশিত হয়। বিবিসি এই ঘটনা নিয়ে শিরোনাম করেছিল, ‘বজ্রপাতে পুরো ফুটবল টিম নিহত’।
সূত্র: বিবিসি ও দ্য ইনডিপেনডেন্টপৃথিবী গত ১৭ বছরে যে কারণে ৩১.৫ ইঞ্চি হেলে গেছে