দেখুন আমের কার্বাইড, ফরমালিন ও কীটনাশক আপনার কী কী ভয়াবহ ক্ষতি করতে পারে

· Prothom Alo

গ্রীষ্ম মানেই আমের উৎসব। তবে ফলের রাজার জনপ্রিয়তার আড়ালে রয়েছে রাসায়নিক ব্যবহারের উদ্বেগ। দূষিত আম কীভাবে চিনবেন, এর স্বাস্থ্যঝুঁকি কী এবং নিরাপদ আম বাছাইয়ের উপায় নিয়েই এই আলোচনা।

Visit newsbetsport.bond for more information.

আমাদের জাতীয় ফল কাঁঠাল হলেও মৌসুমি ফল হিসেবে সবচেয়ে বেশি খাওয়া হয় আম। আম নিয়ে ক্রেজের শেষ নেই। ডায়াবেটিসে আক্রান্ত মানুষও আম খেতে চান, সুগার বাড়লেও আম খান। আমের ব্যাপক চাষ হচ্ছে। বিগত বছরগুলোতে আমের ফলন দিনে দিনে বৃদ্ধি পেয়েছে। সারা দেশে আমের বাগানে সয়লাব। বেশি বিক্রি আর ফলনে লাভের কারণে আমের চাষের প্রতি মানুষ ঝুঁকছে।

আমাদের দেশে মানুষ আম খায় উৎসবের আমেজে। আম আত্মীয়স্বজনকে দিয়ে খাওয়া আমাদের এক অলিখিত রেওয়াজ। ইদানিং করপোরেট হাউসগুলো আম উপহার দেয়। শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই আম খেতে পছন্দ করেন।

অথচ এমন জনপ্রিয় আমকে বর্তমানে নানা উপায়ে দূষিত করা হয়েছে। নানা ধরনের রাসায়নিক উপাদান ব্যবহার করে যত্নের আমকে বিষাক্ত করা হচ্ছে। বিশেষ করে খামারি ও আড়তদাররাই আমে রাসায়নিক পদার্থ দিয়ে দূষিত করছেন।

আম বা অন্য কোনো ফলে মাত্রাতিরিক্ত সিন্থেটিক গ্রোথ হরমোন ব্যবহার ও কোনো প্রকার রেসিডিউয়াল এফেক্টের সময়সীমা না মানার কারণে ফল দ্রুত বড় হয় এবং পরিপক্ব হওয়ার আগেই সেগুলো তুলে বাজারে ভোক্তার কাছে বিক্রি করা হয়। এতে ভোক্তার শরীরে এই সব আম বা ফলের মাধ্যমে সরাসরি সিন্থেটিক হরমোন প্রবেশ করে মানবদেহে প্রজননতন্ত্র, থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোনজনিত জটিলতা সৃষ্টি এবং স্বাভাবিক হরমোন নিঃসরণ বাধাগ্রস্ত করে। এ ছাড়া আমে ব্যবহৃত এই সিন্থেটিক হরমোন মানবদেহের লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক, অণ্ডকোষ ও ডিম্বাশয়কে বিষাক্ত করে তোলে এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে তা ক্যানসারের মতো রোগের কারণ হয়ে দাঁড়ায়।

বাংলাদেশে আম উৎপাদনের নানা পর্যায়ে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়

বাংলাদেশে আম উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বাজারজাতকরণের বিভিন্ন পর্যায়ে কিছু ক্ষেত্রে রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়। তবে সব আমে রাসায়নিক থাকে না। অনেক কৃষক বর্তমানে নিরাপদ ও ভালো কৃষিপদ্ধতিও অনুসরণ করছেন। সমস্যাটি সাধারণত তখন হয়, যখন অনুমোদিত মাত্রার বাইরে বা নিষিদ্ধ রাসায়নিক ব্যবহার করা হয়।
কৃষিতে সিন্থেটিক গ্রোথ হরমোন ব্যবহারের ক্ষতিকারক দিকগুলোর মধ্যে রয়েছে মানুষের হরমোনজনিত জটিলতা ও অঙ্গহানি, উদ্ভিদের স্বাভাবিক বৃদ্ধি ব্যাহত হওয়া, মাটি ও জলের বাস্তুতন্ত্র নষ্ট হওয়া এবং দীর্ঘ মেয়াদে পরিবেশদূষণ। মাত্রাতিরিক্ত বা ভুল প্রয়োগে এসব কৃত্রিম হরমোন মারাত্মক প্রভাব ফেলতে পারে।

মানুষের স্বাস্থ্যের ওপর প্রভাব

হরমোন ও অন্তঃক্ষরা গ্রন্থির ক্ষতি: খাদ্যের মাধ্যমে এসব সিন্থেটিক রাসায়নিক শরীরে প্রবেশ করলে মানুষের প্রজননতন্ত্র, থাইরয়েড ও অন্যান্য হরমোন নিঃসরণ প্রক্রিয়া বাধাগ্রস্ত হতে পারে।
অঙ্গহানি ও ক্যানসার: অতিরিক্ত ব্যবহারে লিভার, কিডনি, মস্তিষ্ক, অগ্ন্যাশয় ও ডিম্বাশয়ের বিষাক্ততার প্রমাণ মিলেছে। এমনকি কোনো কোনো হরমোন ক্যানসারের ঝুঁকিও বাড়াতে পারে।

উদ্ভিদের স্বাভাবিক জীবনচক্রে প্রভাব

বৃদ্ধি বাধাগ্রস্ত হওয়া: মাত্রার সামান্য তারতম্য হলে এটি হরমোনের ভারসাম্য নষ্ট করে, যার ফলে গাছ বামন হয়ে যাওয়া, পাতা হলুদ হওয়া, ফুল আসা বন্ধ হওয়া বা অকালে ফুল-ফল ঝরে যেতে পারে।

আমে ব্যবহৃত হতে পারে এমন রাসায়নিক  

কার্বাইড (Calcium Carbide)

আম দ্রুত পাকানোর জন্য অতীতে ব্যাপকভাবে ব্যবহৃত হতো।
কীভাবে কাজ করে?
কার্বাইড পানির সংস্পর্শে এসে অ্যাসিটিলিন গ্যাস তৈরি করে, যা ফল পাকানোর প্রক্রিয়া ত্বরান্বিত করে।  

মানবদেহে ক্ষতি

• মাথাব্যথা
• মাথা ঘোরা
• বমি বমি ভাব
• শ্বাসকষ্ট
• চোখ ও ত্বকে জ্বালা
• স্নায়ুতন্ত্রের ক্ষতি
• দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি বাড়তে পারে
কার্বাইডে আর্সেনিক ও ফসফরাসজাত দূষক থাকতে পারে, যা বিষক্রিয়ার কারণ হতে পারে।

ইথেফন (Ethephon)

বর্তমানে অনেক ক্ষেত্রে ফল পাকানোর জন্য ইথেফন ব্যবহার করা হয়। সঠিক মাত্রায় ব্যবহার কৃষিতে অনুমোদিত এবং তুলনামূলক নিরাপদ।
অতিরিক্ত বা ভুল ব্যবহার
• পেটব্যথা
• ডায়রিয়া
• বমি
• মাথা ঘোরা
• গলা জ্বালা

ফরমালিন (Formalin)

ফল দীর্ঘদিন সতেজ দেখানোর জন্য কিছু অসাধু ব্যবসায়ী ব্যবহার করে থাকেন।
ক্ষতিকর প্রভাব
• মুখ, গলা ও পাকস্থলীতে জ্বালা
• বমি
• পেটব্যথা
• কিডনি ও লিভারের ক্ষতি
• দীর্ঘ মেয়াদে ক্যানসারের ঝুঁকি
• শ্বাসনালির ক্ষতি

আমগাছে বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়

কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ

আমগাছে বিভিন্ন কীটনাশক ব্যবহার করা হয়।
উদাহরণ:
• ক্লোরপাইরিফস (Chlorpyrifos)
• সাইপারমেথ্রিন (Cypermethrin)
• ইমিডাক্লোপ্রিড (Imidacloprid)
অতিরিক্ত অবশিষ্টাংশ থাকলে যা হয়
• স্নায়বিক সমস্যা
• হরমোনের ভারসাম্যহীনতা
• শিশুদের মস্তিষ্কের বিকাশে প্রভাব
• লিভার ও কিডনির ক্ষতি
• রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা কমে যাওয়া

ছত্রাকনাশক (Fungicides)

সংরক্ষণের সময় পচন রোধে ব্যবহার করা হয়।
উদাহরণ:
• কারবেন্ডাজিম
• ম্যানকোজেব
• থায়োফ্যানেট মিথাইল
অতিরিক্ত গ্রহণে যা হয়
• লিভারের ওপর চাপ
• হরমোনের পরিবর্তন
• অ্যালার্জি

আম খাওয়ার আগে ধুয়ে নিতে হবে

রাসায়নিকযুক্ত আম চেনার কিছু লক্ষণ

সব সময় নিশ্চিতভাবে বোঝা যায় না, তবে কিছু ইঙ্গিত হতে পারে:
• বাইরে সম্পূর্ণ হলুদ, ভেতরে কাঁচা
• খুব দ্রুত পেকে যাওয়া
• অস্বাভাবিক চকচকে রং
• গন্ধ কম বা নেই
• ডাঁটার কাছে কাঁচা কিন্তু বাকি অংশ হলুদ
• খাওয়ার পর গলা জ্বালা
তবে এসব লক্ষণ থাকলেই রাসায়নিক ব্যবহার হয়েছে, এমন নিশ্চিত বলা যায় না।

রাসায়নিকের ঝুঁকি কমানোর উপায়

আম খাওয়ার আগে

• প্রবহমান পানিতে ২-৩ মিনিট ধুয়ে নিন।
• ১৫-২০ মিনিট পরিষ্কার পানিতে ভিজিয়ে রাখুন।
• খোসা ছাড়িয়ে খাওয়া ভালো।
• কাটা আম দীর্ঘ সময় খোলা অবস্থায় রাখবেন না।

অতিরিক্ত হলুদ আমের চেয়ে গাছপাকা আম

কেনার সময়

• মৌসুমের শুরুতে অতিরিক্ত হলুদ আমের চেয়ে গাছপাকা আম বেছে নিন।
• বিশ্বস্ত কৃষক বা নিরাপদ খাদ্য উদ্যোগ থেকে কিনুন।
• ডাঁটার কাছে প্রাকৃতিক আমের ঘ্রাণ আছে কি না দেখুন।
বর্তমানে বাংলাদেশে আমে কার্বাইড ও ফরমালিনের ব্যবহার আগের তুলনায় অনেক কমেছে, কারণ সরকার, নিরাপদ খাদ্য কর্তৃপক্ষ এবং মোবাইল কোর্টের নজরদারি বেড়েছে। তবে কীটনাশকের অবশিষ্টাংশ এখনো জনস্বাস্থ্যের জন্য বেশি উদ্বেগের বিষয় বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করেন।
লেখক: খাদ্য ও পথ্য বিশেষজ্ঞ; প্রধান নির্বাহী, প্রাকৃতিক নিরাময় কেন্দ্র

ছবি: পেকেজলসডটকম

Read full story at source