যে বিরল রোগে কিশোরের চোখ, কান ও নাক দিয়ে রক্ত বের হয়
· Prothom Alo

ভারতের ১১ বছর বয়সী এক বালকের এই অদ্ভুত সমস্যা দেখা দিয়েছে। ছেলেটির চোখ, নাক ও কান দিয়ে হঠাৎ রক্ত পড়তে দেখে আতঙ্কিত হয়ে পড়েন বাবা-মা। বাধ্য হয়ে তাকে হাসপাতালে নিয়ে আসেন তাঁরা। প্রায় এক মাস ধরে এই অদ্ভুত ঘটনা ঘটছিল। কোনো ধরনের আঘাত বা স্পষ্ট কারণ ছাড়াই আচমকা রক্তপাত শুরু হতো। তবে এতে ছেলেটি কোনো ব্যথা পেত না। সাধারণত কয়েক মিনিটের মধ্যেই রক্ত পড়া নিজে থেকেই বন্ধ হয়ে যেত।
হাসপাতালে পরীক্ষার সময় চিকিৎসকেরাও ছেলেটির চোখ ও কান থেকে সরাসরি রক্ত পড়তে দেখেন। কিন্তু অবাক করার বিষয় হলো, তার চোখ, নাক বা কানের ভেতরে কোনো আঘাত, ক্ষত বা অভ্যন্তরীণ গঠনে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা থেকে এমন রক্তপাত হতে পারে।
Visit sportfeeds.autos for more information.
চিকিৎসকেরা প্রথমে ভেবেছিলেন, হয়তো রক্তে কোনো সমস্যা আছে। কিন্তু ল্যাব টেস্টে দেখা গেল, তার রক্তকণিকার সংখ্যা একদম স্বাভাবিক। এমনকি রক্ত জমাট বাঁধতে সাহায্যকারী প্রোটিন ভন উইলেব্র্যান্ড ফ্যাক্টরের মাত্রাও ছিল একেবারে ঠিকঠাক। তবে তার চোখ ও কান থেকে বের হওয়া তরল পরীক্ষা করে চিকিৎসকেরা শতভাগ নিশ্চিত হন যে সেটি অন্য কিছু নয়, তা আসল রক্তই ছিল।
সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে চিকিৎসকেরা রক্তক্ষরণজনিত কোনো রোগ, শরীরের ভেতরের আঘাত, নিজেকে নিজে জখম করা কিংবা পরিচিত অন্য কোনো চিকিৎসাগত কারণের প্রমাণ খুঁজে পেলেন না।
যে রোগের কারণে রোগী প্রতিদিন হাসেন, কিন্তু আনন্দ পান নাঅবাক করার বিষয় হলো, ছেলেটির চোখ, নাক বা কানের ভেতরে কোনো আঘাত, ক্ষত বা অভ্যন্তরীণ গঠনে কোনো ধরনের অস্বাভাবিকতা খুঁজে পাওয়া যায়নি, যা থেকে এমন রক্তপাত হতে পারে।
ছেলেটির বাবা-মা জানান, ঘটনাগুলো বেশির ভাগ সময়ই তখন ঘটত, যখন ছেলেটি কোনো মানসিক চাপে থাকত। বিশেষ করে পড়াশোনার চাপ, সহপাঠীদের সঙ্গে কোনো ঝামেলা কিংবা পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নিয়ে বাবা-মায়ের অতিরিক্ত প্রত্যাশা তৈরি হলেই তার শরীর এভাবে সাড়া দিত। পরবর্তী সময়ে এই তথ্যের ওপর ভিত্তি করে ছেলেটির মানসিক অবস্থা পরীক্ষার ব্যবস্থাও করা হয়।
একজন অভিজ্ঞ মনোরোগ বিশেষজ্ঞ ছেলেটি এবং তার বাবা-মায়ের সঙ্গে আলাদাভাবে কথা বলেন। কাউন্সেলিং সেশনের সময় তাঁদের আচরণ ও পারস্পরিক সম্পর্কও গভীরভাবে পর্যবেক্ষণ করা হয়। এই মনস্তাত্ত্বিক পরীক্ষা থেকে স্পষ্ট ধারণা মেলে, পড়াশোনার অতিরিক্ত চাপ এবং পরীক্ষায় ভালো ফলাফল নিয়ে বাবা-মায়ের মাত্রাতিরিক্ত প্রত্যাশাই ছেলেটির মনে তীব্র মানসিক চাপের জন্ম দিচ্ছিল।
শরীরের সব ধরনের পরীক্ষা-নিরীক্ষা করার পরও যখন রক্তপাতের কোনো শারীরিক কারণ বা রোগ খুঁজে পাওয়া গেল না, তখন চিকিৎসকেরা নিশ্চিত হন, এই লক্ষণগুলো আসলে হেমাটিড্রোসিস নামে একটি বিরল অবস্থার বহিঃপ্রকাশ। এটি মূলত তীব্র মানসিক চাপ থেকে তৈরি হওয়া অত্যন্ত বিরল একটি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত মানুষের চোখ, কান, নাক দিয়ে হঠাৎ করেই রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে। চিকিৎসাবিজ্ঞানে এই রোগকে রক্তঘাম বলা হয়; যদিও আধুনিক গবেষণায় দেখা গেছে, তরলটি সরাসরি শরীরের ঘামগ্রন্থি থেকে বের হয় না।
বিরল রোগে আক্রান্ত যে কিশোরী ১৪ বছর কিছু খেতে পারেনিহেমাটিড্রোসিস মূলত তীব্র মানসিক চাপ থেকে তৈরি হওয়া অত্যন্ত বিরল একটি রোগ। এই রোগে আক্রান্ত মানুষের চোখ, কান, নাক দিয়ে হঠাৎ করেই রক্তক্ষরণ হতে শুরু করে।
রোগটি শনাক্তের পর চিকিৎসকেরা ছেলেটিকে প্রোপানোলল নামে একটি ওষুধ দেন। এটি মূলত তীব্র মানসিক উত্তেজনায় শরীরের হরমোনের অতিপ্রতিক্রিয়া অবস্থাকে শান্ত করতে সাহায্য করে। ওষুধ দেওয়ার পাশাপাশি তার জন্য কগনিটিভ বিহেভিওরাল থেরাপির ব্যবস্থা করা হয়। এটি একধরনের মনস্তাত্ত্বিক পরামর্শ থেরাপি, যার মাধ্যমে ছেলেটিকে পড়াশোনার চাপ ও মানসিক অস্থিরতা নিজে নিজেই সামলে নেওয়ার কৌশল শেখানো হয়। শুধু ছেলেটিই নয়, তার বাবা-মাকেও বিশেষ কাউন্সেলিং দেওয়া হয়, যেন তাঁরা সন্তানের ওপর পড়াশোনার চাপ কমিয়ে ঘরে একটি সুন্দর ও সহযোগিতাপূর্ণ পরিবেশ তৈরি করতে পারেন।
সঠিক চিকিৎসা ও মানসিক সহায়তার ফল পাওয়া যায় হাতেনাতেই। মাত্র দুই সপ্তাহের মধ্যেই ছেলেটির রক্তপাতের ঘটনা অনেক কমে আসে। চিকিৎসা শুরুর চার সপ্তাহ পর দেখা যায়, রক্ত পড়ার তীব্রতা কমে একদম হালকা হয়ে এসেছে, কেবল মাঝেমধ্যে ঘটে। অবশেষে চিকিৎসা শুরুর তিন মাস পর ছেলেটি পুরোপুরি সুস্থ ও উপসর্গমুক্ত হয়ে তার স্বাভাবিক দৈনন্দিন কাজকর্মে ফিরে যায়।
ছেলেটির চিকিৎসকেরা তাঁদের মেডিকেল রিপোর্টে জানিয়েছেন, বিশ্বজুড়ে চিকিৎসাবিজ্ঞানের ইতিহাসে হেমাটিড্রোসিসের মাত্র ৫০টিরও কম ঘটনা নথিপত্রে রেকর্ড করা আছে। গত কয়েক দশক ধরে এই অদ্ভুত রোগ নিয়ে চিকিৎসকেরা লেখালেখি করলেও আজ পর্যন্ত এর আসল কারণ কী, তা নিশ্চিতভাবে জানা যায়নি।
মোবিয়াস সিনড্রোম: যে রোগে আক্রান্ত হলে আর হাসতে পারবেন না২০১৭ সালে ১০ বছরের এক মেয়ে স্কুলে কঠোর শাস্তি ও বাড়িতে পড়ালেখার চাপের কারণে তীব্র মানসিক ট্রমার শিকার হয়। ফলে তার মাথার তালু থেকে রক্ত পড়তে শুরু করেছিল।
এই রোগটি নিয়ে বিজ্ঞানীদের একটি প্রচলিত ব্যাখ্যা রয়েছে। তাঁদের মতে, কোনো মানুষ যখন অতিরিক্ত মানসিক চাপ, চরম ভয় বা গভীর কোনো মানসিক আঘাতের মধ্য দিয়ে যায়, তখন তার শরীরের ঘামগ্রন্থির চারপাশের ক্ষুদ্র রক্তনালিগুলো ফেটে যেতে পারে। ফলে রক্তকণিকাগুলো ঘামনালিতে প্রবেশ করে এবং একপর্যায়ে চামড়া ভেদ করে বাইরে বেরিয়ে আসে। তবে আধুনিক গবেষণা এখনো নিশ্চিত করতে পারেনি যে এই রক্ত আসলেই ঘামগ্রন্থি দিয়ে বাইরে আসে কি না।
এর আগে ২০১৭ সালে ১০ বছরের এক মেয়ে স্কুলে কঠোর শাস্তি ও বাড়িতে পড়ালেখার চাপের কারণে তীব্র মানসিক ট্রমার শিকার হয়। ফলে তার মাথার তালু থেকে রক্ত পড়তে শুরু করেছিল। পরে সাইকোথেরাপি, সঠিক ওষুধ এবং বাবা-মায়ের আচরণ পরিবর্তনের মাধ্যমে সে সুস্থ হয়ে ওঠে।
একইভাবে ২০২২ সালে এক ১৪ বছরের কিশোরের ক্ষেত্রে স্কুলের পরীক্ষা ও ক্লাস শুরুর তীব্র উদ্বেগের সময় শরীর থেকে রক্তক্ষরণ বেড়ে যাওয়ার ঘটনা ঘটে। তাকেও থেরাপি ও মানসিক চাপ কমানোর ওষুধ দিয়ে সুস্থ করা হয়। গবেষকেরা খেয়াল করেছেন, চিকিৎসাবিজ্ঞানে নথিভুক্ত হেমাটিড্রোসিসের একটি বড় অংশের উৎস হলো এশিয়া মহাদেশ, বিশেষ করে ভারত ও পাকিস্তান।
সূত্র: লাইভ সায়েন্সপ্রেডা-উইলি সিন্ড্রোম: যে বিরল রোগে আক্রান্ত হলে কখনো পেটের ক্ষুধা মেটে না