রাজনৈতিক বিবেচনার ঊর্ধ্বে থাকতে হবে
· Prothom Alo

দায়িত্ব নেওয়ার এক মাসের মধ্যেই নির্বাচনী ইশতেহারের প্রতিশ্রুতি অনুযায়ী বিএনপি সরকার ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচি চালু করেছে। রাজধানীর কড়াইল বস্তিসহ সারা দেশের ১৪টি জায়গায় বুধবার এই কর্মসূচির উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। সরকারের ঘোষণা অনুযায়ী, ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির আওতায় মাসিক ২ হাজার ৫০০ টাকা করে ভাতা পাবে উপকারভোগী পরিবার। দারিদ্র্য বিমোচন ও নারীর ক্ষমতায়নের ক্ষেত্রে সামাজিক সুরক্ষার এই কর্মসূচি সহায়ক ভূমিকা পালন করবে। তবে বিপুল অর্থের সংস্থান, রাজনৈতিক প্রভাবমুক্ত থেকে প্রকৃত উপকারভোগীদের চিহ্নিত করা এবং বিক্ষিপ্ত ও বিশৃঙ্খল সামাজিক সুরক্ষা খাতকে একই ছাতার নিচে আনা সরকারের জন্য বড় চ্যালেঞ্জ বলেই আমরা মনে করি।
Visit extract-html.com for more information.
দেশে তিন বছরের বেশি সময় ধরে উচ্চ মূল্যস্ফীতি চলছে। ব্যবসা–বিনিয়োগ ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধিতে ভাটার কারণে কর্মসংস্থানের সুযোগও কমেছে। ফলে কয়েক দশক ক্রমাগত কমার পর দারিদ্র্য পরিস্থিতি আবারও ঊর্ধ্বমুখী হয়েছে। গবেষণাপ্রতিষ্ঠান পিপিআরসির জরিপ বলছে, বাংলাদেশে বর্তমানে দারিদ্র্যের হার প্রায় ২৭ শতাংশ। উচ্চ মূল্যস্ফীতির কারণে ক্রমাগত প্রকৃত আয় কমে যাওয়ায় খাদ্যনিরাপত্তাহীনতাও বেড়েছে। উচ্চ মূল্যস্ফীতি, দারিদ্র্য ও খাদ্য অনিরাপত্তার এই পরিস্থিতির সবচেয়ে বড় ধাক্কা লাগে নারী ও শিশুদের ওপর। অর্থসংকটে পরিবারের খাবার কমে গেলে প্রথমে নিজের খাবার কমিয়ে দেন মা, আর পুষ্টির ঘাটতির সবচেয়ে বড় বোঝা বহন করে শিশু। দারিদ্র্য ও বৈষম্যের এই চক্র জিইয়ে রেখে একটি সমৃদ্ধ জাতি গঠন অসম্ভব কল্পনা। এ রকম বাস্তবতায় ফ্যামিলি কার্ডের মতো কর্মসূচি নিঃসন্দেহে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের পরিবারগুলোর জন্য কিছুটা স্বস্তি আনতে পারবে।
পাইলট প্রকল্পের অংশ হিসেবে প্রথম পর্যায়ে ৩৭ হাজার ৫৬৭টি নারীপ্রধান পরিবারকে ভাতা দেওয়া হয়েছে। সরকারের প্রতিশ্রুতি হলো, দুই কোটি পরিবারের কাছে এই উপকার পৌঁছে দেওয়া। এর জন্য মাসে সম্ভাব্য ৫ হাজার কোটি টাকা ও বছরে প্রায় ৬০ হাজার কোটি টাকার প্রয়োজন হবে। বিপুল এই অর্থের সংস্থান নির্ভর করবে রাজস্ব আয়ের ওপর। বাংলাদেশে বহু বছর ধরেই জিডিপির তুলনায় রাজস্ব আয় দক্ষিণ এশিয়ার দেশগুলোর মধ্যে তলানিতে স্থির হয়ে আছে। সে ক্ষেত্রে পরোক্ষ করের বোঝা কমানো, প্রত্যক্ষ কর বাড়ানো ও কর ফাঁকির ফাঁকফোকর বন্ধ করাসহ রাজস্ব খাত সংস্কারের উদ্যোগ নেওয়া সবচেয়ে জরুরি।
বাংলাদেশের সামাজিক সুরক্ষা খাতের সবচেয়ে বড় দুর্বলতা হলো নকশাগত দুর্বলতা। বর্তমানে প্রায় ২৫ মন্ত্রণালয়ের অধীন ১০০টির বেশি সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি চালু আছে। উপকারভোগী বাছাইয়ে রাজনৈতিক প্রভাব থাকায় অনেক ক্ষেত্রেই প্রকৃত ব্যক্তিরা যেমন বঞ্চিত হয়েছেন; আবার অনেক ক্ষেত্রে একই ব্যক্তি একাধিক কর্মসূচির সুবিধাও পেয়েছেন। এ অবস্থায় ফ্যামিলি কার্ডের সঙ্গে বহুবিস্তৃত ও বিশৃঙ্খল সামাজিক সুরক্ষা খাতকে একটি সুশৃঙ্খল ও সমন্বিত কাঠামোর ওপর দাঁড় করানো নতুন সরকারের একটি বড় দায়িত্ব।
ফ্যামিলি কার্ড কর্মসূচির ক্ষেত্রে কোনোভাবেই যেন রাজনৈতিক বিবেচনা কাজ না করে, সেদিকে সর্বোচ্চ সতর্ক থাকা প্রয়োজন। ফ্যামিলি কার্ড দেওয়ার নামে কিছু জায়গায় প্রতারণার অভিযোগ উঠেছে। অতীত অভিজ্ঞতায় দেখা গেছে, মধ্যস্বত্বভোগীদের কাছেও দারিদ্র্য উপকারভোগীরা প্রতারিত হয়। সরকারকে এসব প্রতারক ও সুযোগসন্ধানীদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নিতে হবে।