‘ছেলেকে ডাক্তার দেখিয়েছি, ওষুধও পেয়েছি, শান্তি লাগছে’
· Prothom Alo

কক্সবাজারের রামুর জোয়ারিয়ানালা ইউনিয়নের চা-বাগান এলাকায় থাকেন দিদারুল আলম। তাঁর এক বছর বয়সী শিশু মো. মিজান সর্দি–জ্বরে আক্রান্ত সাত দিন ধরে। স্থানীয় একজন চিকিৎসকের কাছে ছেলেকে নিয়েও গিয়েছিলেন দিদারুল, কিন্তু কোনো উন্নতি হয়নি। শহরে গিয়ে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক দেখানোর সামর্থ্যও নেই তাঁর। বাড়ি থেকে তিন কিলোমিটার দূরে রামুর বাইপাস সড়কের পাশে আমতলিয়াপাড়ায় বিনা মূল্যে চিকিৎসাশিবির (ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প) হচ্ছে শুনে ছুটে যান তিনি।
Visit sportnewz.click for more information.
‘মানবতার জন্য বিশেষজ্ঞ চিকিৎসা’ শীর্ষক ওই চিকিৎসাশিবিরের আয়োজন করে ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশন। দুপুর ১২টায় ওই ক্যাম্পের এক পাশে অসুস্থ মিজানকে বুকে নিয়ে দাঁড়িয়েছিলেন দিদারুল আলম। পেশায় কাঠমিস্ত্রি দিদারুল চিকিৎসককে দেখিয়ে বিনা মূল্যে ওষুধও নেন। ব্যবস্থাপত্র হাতে নিয়ে দিদারুল প্রথম আলোকে বলেন, তাঁর দুই ছেলের মধ্যে ছোট ছেলে মিজানের সর্দি-জ্বর শুরু হয় সাত দিন আগে। পাঁচ দিন আগে রামুর চৌমুহনীতে গিয়ে একজন চিকিৎসককে দেখান। চিকিৎসক পরীক্ষা করে ওষুধও দিয়েছিলেন। তবে জ্বর সর্দি কমেনি। সন্তানের কান্নাকাটিও সহ্য হচ্ছে না। ২৫ কিলোমিটার দূরে শহরের হাসপাতালে গিয়ে চিকিৎসক দেখানোর সামর্থ্যও তাঁর নেই। দিদারুল বলেন, ‘এখানে এসে ছেলেকে ডাক্তার দেখিয়েছি। ওষুধও পেয়েছি। সব মিলিয়ে শান্তি লাগছে।’
ছয় মাস বয়সী আরেক শিশু নিয়ে মেডিক্যাল ক্যাম্পে আসেন মুরাপাড়ার গৃহবধূ সাবিনা ইয়াছমিন। তিনি বলেন, সন্তানকে নিয়ে সকাল সাড়ে ৯টায় ক্যাম্পে আসেন। চিকিৎসক সন্তানকে দেখে ব্যবস্থাপত্র দিয়েছেন। ওষুধও পেয়েছেন বিনা মূল্যে। এ জন্য খুশি লাগছে বলে জানালেন তিনি।
ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশন আয়োজিত এই ক্যাম্পে চিকিৎসাসেবা ও ওষুধ পেয়ে কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন স্থানীয় আমতলিয়াপাড়ার বাসিন্দা হোছন আহমদ (৭৩)। তিনি বলেন, ‘ডায়াবেটিস থাকায় প্রতিদিন ইনসুলিন নিতে হয়। কোমরসহ সারা শরীর ব্যথা, রাতে ঘুমাতে পারি না। টাকার অভাবে ঠিকমতো ওষুধও কিনতে পারি না। এখানে টাকা ছাড়াই চিকিৎসা করাতে পেরেছি, ওষুধও পেয়েছি, এবার কিছুদিন শান্তিতে ঘুমাতে পারব। ’
২০১৬ সালের ১ জুলাই হোলি আর্টিজান বেকারির জঙ্গি হামলায় স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল দেশের মানুষ। দুই বন্ধুকে ছেড়ে আসতে অস্বীকৃতি জানানোয় জঙ্গিদের হাতে নৃশংসভাবে নিহত হন ফারাজ আইয়াজ হোসেন। সাহসী এই তরুণের নামে ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশন গড়েছে তাঁর পরিবার। ফাউন্ডেশন আনুষ্ঠানিকভাবে যাত্রা শুরু করে ২০১৭ সালের ৩ ডিসেম্বর। ফারাজ আইয়াজ হোসেন বন্ধুত্ব, সাহস ও মানবিকতার যে নিদর্শন দেখিয়েছিলেন, সেই অনুভূতি ধারণ ও লালন করে মানুষের পাশে দাঁড়িয়েছে তাঁর নামে গড়া ফাউন্ডেশন। এই ফাউন্ডেশনের পক্ষ থেকে বন্যাদুর্গত এলাকায় খাদ্যসহায়তা প্রদান, হতদরিদ্র রোগীদের বিনা মূল্যে চিকিৎসাসেবা, ওষুধ প্রদানসহ সারা দেশে নানা মানবিক কার্যক্রম পরিচালিত হচ্ছে।
চিকিৎসাশিবিরে এক শিশুরোগীকে সেবা দিচ্ছেন চিকিৎসক। আজ দুপুরেচিকিৎসাসেবা পেলেন ২৩১ রোগী
দেশের অন্যতম ওষুধ প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এসকেএফের সহযোগিতায় রামুর আমতলিয়াপাড়ার একটি ভবনের নিচতলায় চলা ফারাজ হোসেন ফাউন্ডেশনের বিনা মূল্যে চিকিৎসাশিবির কার্যক্রম শুরু হয় সকাল ৯টায়। তখন সেখানে উপস্থিত থাকেন বিভিন্ন এলাকা থেকে আসা শতাধিক রোগী। বেশির ভাগ ছিল নারী ও শিশু।
শুরুতে রোগীদের উদ্দেশ্যে ফ্রি মেডিক্যাল ক্যাম্প আয়োজনের লক্ষ উদ্দেশ্য তুলে ধরেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড কক্সবাজারের আঞ্চলিক বিক্রয় ব্যবস্থাপক মো. আরিফুর রহমান খান। এরপর বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৩১ রোগীর চিকিৎসা দেন চিকিৎসক রাদ শারার রহমান, ইয়াছিন মো. আবদুল্লাহ ও তাশনোভা শাওরীন রহমান।
চিকিৎসকেরা জানান, তাঁরা গাইনি, মেডিসিন, সার্জারি, নাক-কান-গলা, হৃদ্রোগ, ডায়াবেটিস, বক্ষব্যাধি, শিশু রোগের চিকিৎসা দিয়েছেন। সহযোগিতা করেন এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালসের জ্যেষ্ঠ মাঠ ব্যবস্থাপক মো. মোস্তাফিজুর রহমান, সিনিয়র মেডিক্যাল সার্ভিসেস অফিসার রাসেল আহমদ, মেডিক্যাল সার্ভিসেস অফিসার হাফিজুল ইসলাম প্রমুখ।
এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যাল লিমিটেড কক্সবাজারের আঞ্চলিক বিক্রয় ব্যবস্থাপক মো. আরিফুর রহমান খান বলেন, বেলা ৩টা পর্যন্ত ২৩১ জন রোগীকে স্বাস্থ্যসেবার পাশাপাশি বিনা মূল্যে ওষুধও বিতরণ করা হয়।